
জসীমউদ্দীন ইতি ঠাকুরগাঁও ।
প্রশাসনিক রদবদল বা কোনো কর্মকর্তার দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানো সরকারি চাকরিতে একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু ঠাকুরগাঁওয়ের জেলা প্রশাসক ইশরাত ফারজানার ব্যক্তিগত কারণে দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর বিষয়টি সাধারণ মানুষের মনে এক গভীর কৌতূহল ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জনমনে প্রশ্ন উঠছে—ঠিক কী কারণে এমন একজন কর্মঠ ও উদ্যমী কর্মকর্তা আকস্মিক দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ালেন? প্রশাসনিক কাজের এই ধারাবাহিকতায় কি কোনো ছন্দপতন ঘটবে?
কোনো সরকারি কর্মকর্তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তকে ব্যক্তিগতভাবেই দেখা উচিত। কিন্তু যখন একজন কর্মকর্তা নিজ কর্মগুণে একটি জেলার মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেন, তখন তাঁর বিদায় কেবল একটি দাপ্তরিক ঘটনা থাকে না, তা হয়ে ওঠে একটি জনপদের আলোচনার বিষয়। ইশরাত ফারজানার ক্ষেত্রেও ঠিক সেটাই ঘটেছে। ঠাকুরগাঁওয়ের প্রশাসনিক গতিশীলতা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর যে সংস্কৃতি তিনি গড়ে তুলেছিলেন, তা সাধারণ মানুষকে প্রশাসনমুখী করেছে। সেই জায়গা থেকে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই আতঙ্কিত—এখন কি সেই উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও সেবার ধারা ধীরগতির হয়ে পড়বে?
সাধারণ মানুষের এই কৌতূহল কোনো নেতিবাচক কিছু নয়; এটি বরং প্রশাসনের প্রতি মানুষের গভীর আগ্রহ ও আস্থার বহিঃপ্রকাশ। ঠাকুরগাঁওবাসী চায়, প্রশাসনের প্রতিটি স্তর স্বচ্ছ থাকুক এবং উন্নয়নের যে গতি ইশরাত ফারজানা সঞ্চার করেছিলেন, তা যেন কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত না হয়।
একজন সাংবাদিক হিসেবে আমরা লক্ষ্য করছি, প্রশাসনের নীতিনির্ধারণী মহলে যখনই কোনো রদবদল হয়, তখন এক ধরণের ‘প্রশাসনিক শূন্যতা’ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ঠাকুরগাঁওয়ের প্রেক্ষাপটে এই আশঙ্কা আরও প্রকট, কারণ ইশরাত ফারজানার কাজের ধরণ ছিল সরাসরি মাঠপর্যায়ে। তিনি কেবল কার্যালয়ে বসে ফাইল স্বাক্ষর করেননি, বরং রোদ-বৃষ্টি-শীত উপেক্ষা করে ছুটে গিয়েছেন মানুষের দুয়ারে। প্রশাসনের এই ‘মানবিক রূপ’ দেখার পর, মানুষ এখন নতুন যিনি আসবেন, তার কাছ থেকেও একই ধরণের সততা ও নিষ্ঠা প্রত্যাশা করছে।
অনেকে হয়তো ভাবছেন, তাঁর এই সরে দাঁড়ানোর পেছনে প্রশাসনিক কোনো চাপ বা ভিন্ন কোনো প্রেক্ষাপট রয়েছে কি না। কিন্তু আমরা বিশ্বাস করতে চাই, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা এমন এক প্রক্রিয়ার অংশ, যা কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়। বরং একজন সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তার প্রস্থান পরবর্তী যিনি দায়িত্ব নেবেন, তার জন্য একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ তৈরি করে যায়।
ঠাকুরগাঁওয়ের প্রশাসনিক কাঠামো এখন একটি সন্ধিক্ষণে। জেলা প্রশাসকের পদটি একটি জেলার মূল চালিকাশক্তি। আমরা আশা করব, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ঠাকুরগাঁওয়ের বর্তমান উন্নয়নের ধারাকে অব্যাহত রাখতে এমন কাউকেই নির্বাচন করবেন, যিনি ইশরাত ফারজানার মতোই জনবান্ধব ও সাহসী হবেন।
পরিশেষে, ইশরাত ফারজানার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তকে আমরা সম্মান জানাই। তাঁর কর্মময় জীবন যেখানেই থাকুক, মঙ্গলময় হোক। তবে ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষ যেন এই পরিবর্তনে হতাশ না হয়, প্রশাসনের সেবার মান যেন এক চুলও না কমে—সেটিই আমাদের আজকের দাবি।
উন্নয়ন ও জনসেবা কোনো ব্যক্তির নয়, বরং প্রতিষ্ঠানের অঙ্গীকার। সেই অঙ্গীকার পূরণই হবে আগামীর ঠাকুরগাঁওয়ের প্রধান চ্যালেঞ্জ।