খুলনায় লোডশেডিং ও জ্বালানি সংকটে বিপর্যস্ত চিংড়ি শিল্প, বাড়ছে উৎপাদন খরচ

রাসেল আহমেদ,খুলনা

 

খুলনায় তীব্র লোডশেডিং ও জ্বালানি সংকটে হিমায়িত চিংড়ি শিল্পে তৈরি হয়েছে অচলাবস্থা। উৎপাদন ধরে রাখতে গিয়ে প্রতিদিন বাড়তি ব্যয়ের চাপ নিতে হচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলোকে। বিদ্যুৎ না থাকায় জেনারেটর চালাতে বিপুল পরিমাণ ডিজেল প্রয়োজন হলেও তা সহজে না পাওয়ায় ভোগান্তি আরও বাড়ছে। এতে করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী এই খাতটি টিকে থাকা নিয়েই শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
রূপসা উপজেলার ইলাইপুরে অবস্থিত ফ্রেস ফুডস লিমিটেডের কর্তৃপক্ষ জানায়, মৌসুম পুরোপুরি শুরু না হলেও কারখানা সচল রাখতে সব বিভাগ চালু রাখতে হচ্ছে। তবে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। গত বুধবার সকাল থেকে রাত পর্যন্ত পাঁচ দফায় ৭ ঘণ্টা ৪০ মিনিট বিদ্যুৎ ছিল না। যেখানে ২৪ ঘণ্টায় বিদ্যুৎ বিল আসে প্রায় ২৯ হাজার টাকা, সেখানে জেনারেটর চালাতে ৫৫ হাজার ৩১৫ টাকার ডিজেল কিনতে হয়েছে। একদিনেই ৩০ হাজার টাকার বেশি অতিরিক্ত ব্যয় গুনতে হয়েছে প্রতিষ্ঠানটিকে।
সাউদার্ণ ফুডস লিমিটেডের এজিএম মো. মিজানুর রহমান ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘একদিনে পাঁচ দফায় ৭ ঘণ্টা ৪০ মিনিট লোডশেডিং হয়েছে। ফ্যাক্টরি সচল রাখতে ৬৩ হাজার ৮৫০ টাকার ডিজেল কিনতে হয়েছে। প্রতি ঘণ্টায় জেনারেটরে প্রায় ৭৫ লিটার ডিজেল লাগে। বিদ্যুৎ থাকলে যেখানে ৩৫ হাজার টাকায় কাজ চলে, সেখানে ডিজেলে খরচ হচ্ছে দ্বিগুণের বেশি।’
তিনি বলেন, ‘আগে পাম্পে গেলেই ডিজেল পাওয়া যেত। এখন চাহিদা অনুযায়ী পাওয়া যাচ্ছে না। তেল পেতে বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন করতে হচ্ছে। উৎপাদনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শ্রমিকদের বেতন দিতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে।’
রূপসার রোজেমকো ফুডস লিমিটেডের পরিচালক (তদন্ত) সেলিম রেজা বলেন, ‘আমাদের পাঁচটি হিমাগারে প্রায় ৩৫ কোটি টাকার মাছ মজুত রয়েছে। এগুলো রক্ষা করতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ জরুরি। কিন্তু লোডশেডিংয়ের কারণে বড় ধরনের ঝুঁকিতে আছি।’
একই প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক (তদন্ত) নাজমুল হুদা চৌধুরী বলেন, ‘এক ঘণ্টায় যেখানে বিদ্যুৎ বিল হয় সাড়ে চার হাজার টাকা, সেখানে বিদ্যুৎ না থাকলে ডিজেল কিনতে হয় প্রায় ২৩ হাজার টাকার। অর্থাৎ প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ১৮ হাজার ৫০০ টাকা বাড়তি খরচ হচ্ছে। চার শতাধিক শ্রমিক-কর্মচারীর বেতন দিতেও চাপ তৈরি হয়েছে।’
তারা চিংড়ি শিল্পকে অগ্রাধিকার খাত হিসেবে বিবেচনা করে সহজ শর্তে সরাসরি ডিপো থেকে জ্বালানি সরবরাহের দাবি জানান।
এদিকে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের অংশ হিসেবে সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে দোকানপাট বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন নগরীর ব্যবসায়ীরা। খুলনা হার্ডমেটাল গ্যালারির হৃদয় ইলেকট্রনিক্সের টিএসএম মো. আনোয়ার জাহিদ ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘দিনের বেলায় তীব্র গরমে ক্রেতা কম থাকে। সন্ধ্যার পর বিক্রি বাড়ে। কিন্তু ৭টার মধ্যে দোকান বন্ধ করতে হওয়ায় বিক্রি অন্তত ৩০ শতাংশ কমে গেছে।’
লোডশেডিংয়ের প্রভাব পড়েছে শিক্ষার্থীদের ওপরও। রূপসা উপজেলার বাগমারা এলাকার এসএসসি পরীক্ষার্থী চাঁদনী আক্তার, শাকিলা ইয়াসমিন নদী, জাহারীন তাসনিম, জান্নাত জেরিন, মিম্মা আক্তার পিয়ামনি, আরমান রানা, মুসফিক আল রাতুল, মুসফিকা আফরিন, রেসমি আক্তার, মিতু খাতুন ও মাহিরা আক্তার মিতু জানায়, ‘সন্ধ্যার পর পড়তে বসার কিছুক্ষণের মধ্যেই বিদ্যুৎ চলে যায়। অনেক সময় দেড় থেকে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত থাকে না। তীব্র গরমে পড়াশোনা করা খুব কষ্টকর হয়ে পড়েছে।’
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় প্রতিদিনই ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। বৃহস্পতিবার বিকেলে প্রায় ১৮২ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল। দুপুরেও ঘাটতি ছিল ১৫৮ মেগাওয়াট। ফলে ফিডারভিত্তিক লোডশেডিং দিতে হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করা এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত না হলে চিংড়ি শিল্পসহ ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিক্ষাখাতে এর নেতিবাচক প্রভাব আরও বাড়বে।

এ রকম আরো সংবাদ

আমাদের সাথে থাকুন

0FansLike
0SubscribersSubscribe

সর্বশেষ সংবাদ