
জসীমউদ্দিন ইতি ঠাকুরগাঁও।
বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনের ইতিহাসে কিছু প্রতিষ্ঠানের পথচলা কেবল একটি পরিক্রমা নয়, বরং জনমানুষের ভাগ্যবদল ও আত্মনির্ভরশীলতার এক বলিষ্ঠ সংগ্রাম। উত্তর জনপদের শান্ত জনপদ ঠাকুরগাঁও থেকে যে প্রদীপটি ১৯৮৮ সালের প্রলয়ঙ্করী বন্যার আর্তনাদ আর হাহাকারের মাঝে জ্বলে উঠেছিল, সেই প্রদীপটি আজ ৩৮ বছরের আলোকোজ্জ্বল পথ পেরিয়ে এক বিশাল বটবৃক্ষে পরিণত হয়েছে। ‘ইকো-সোশ্যাল ডেভলপমেন্ট অর্গানাইজেশন’ বা ইএসডিও (ESDO) আজ কেবল একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার নাম নয়; এটি দেশের ৫৬টি জেলার প্রায় দেড় কোটিরও বেশি মানুষের আস্থার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
শুক্রবার (৩ এপ্রিল) সংস্থাটির ৩৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর মাহেন্দ্রক্ষণে দাঁড়িয়ে এর অতীত পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এটি শুরু হয়েছিল একদল স্বপ্নবাজ তরুণের হাত ধরে। সেই সময়কার বিধ্বস্ত জনপদকে টেনে তোলার যে অঙ্গীকার তারা করেছিলেন, আজ তা জাতীয় পর্যায়ে এক মহীরুহে রূপ নিয়েছে। ঠাকুরগাঁওয়ের গোবিন্দনগরস্থ প্রধান কার্যালয় থেকে শুরু হওয়া এই অভিযাত্রা আজ দেশের ৮টি বিভাগের ৪২২টি উপজেলায় বিস্তৃত। ৩৪ লাখ ৯০ হাজার পরিবারের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত থেকে ইএসডিও প্রমাণ করেছে যে, সদিচ্ছা ও নিষ্ঠা থাকলে প্রান্তিক জনপদ থেকেও জাতীয় পর্যায়ের পরিবর্তন আনা সম্ভব।
ইএসডিও-এর দীর্ঘ ৩৮ বছরের সফলতার মূল মন্ত্র হলো—‘তৃণমূল মানুষের সাথে, তৃণমূল মানুষের পাশে’। এটি কেবল একটি স্লোগান নয়, বরং তাদের প্রতিটি প্রকল্পের মূল ভিত্তি। সংস্থাটির প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক ড. মুহম্মদ শহীদ উজ জামান এবং পরিচালক (প্রশাসন) ও ইকো পাঠশালা অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ ড. সেলিমা আখতারের সুযোগ্য ও দূরদর্শী নেতৃত্বে ইএসডিও আজ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, পরিবেশ এবং ক্ষুদ্রঋণের মতো সংবেদনশীল খাতগুলোতে বিপ্লব ঘটিয়েছে। বিশেষ করে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য ঘোষিত প্রায় ৫০০ কোটি ১৭ লাখ টাকার বিশাল বাজেট এবং ৫ হাজার ৮০৮ জন দক্ষ কর্মীবাহিনীর সক্রিয় উপস্থিতি সংস্থাটির প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে ইএসডিও-এর কার্যক্রমের বহুমুখিতা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১০৭টি চলমান প্রকল্পের মাধ্যমে তারা কেবল দারিদ্র্য বিমোচনই করছে না, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা, স্মার্ট কৃষি ও আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে কাজ করছে। ঠাকুরগাঁও জেলাকে একটি ‘শিক্ষার নগরী’ হিসেবে গড়ে তোলার যে লক্ষ্য ইএসডিও গ্রহণ করেছে, তা এ অঞ্চলের আগামী প্রজন্মের জন্য এক অমূল্য সম্পদ। ইকো পাঠশালা ও কলেজের মাধ্যমে তারা যে মানসম্মত শিক্ষার ভিত্তি গড়ে তুলছে, তা জাতীয় শিক্ষানীতির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বড় ভূমিকা রাখছে।
প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন থেকেও পরিষ্কার যে, ইএসডিও সরকারের উন্নয়নের এক অপরিহার্য অংশীদার। মাঠ পর্যায়ে তাদের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং তৃণমূল মানুষের সাথে নিবিড় সম্পর্ক দেশি-বিদেশি ৪২টি উন্নয়ন অংশীদারকে আকৃষ্ট করেছে। ৫৬টি জেলায় ৫৩৭টি ব্রাঞ্চ অফিসের মাধ্যমে যে বিশাল সেবা নেটওয়ার্ক তারা গড়ে তুলেছে, তা যেকোনো উন্নয়ন সংস্থার জন্য একটি মডেল হতে পারে।
তবে আগামীর পথচলা আরও চ্যালেঞ্জিং। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব, ডিজিটাল বৈষম্য এবং প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল বিশ্ব অর্থনীতির সাথে তাল মিলিয়ে তৃণমূলের প্রান্তিক মানুষকে ‘স্মার্ট নাগরিক’ হিসেবে গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। ইএসডিও-এর ৩৮ বছরের অভিজ্ঞতা ও অর্জিত জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে ২০৩০ সালের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অর্জনে আরও জোরালো ভূমিকা রাখবে—এমনটাই আমাদের প্রত্যাশা।
সবশেষে, ইএসডিও-এর এই আনন্দঘন মুহূর্তে আমরা অভিনন্দন জানাই সেই সকল অকুতোভয় মানুষকে, যারা অভাব আর অনিশ্চয়তার মাঝেও ইএসডিও-এর হাত ধরে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। অভিনন্দন জানাই সেই সকল মাঠকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকদের, যারা রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সেবার আলো পৌঁছে দিচ্ছেন। ইএসডিও-এর ৩৮ বছরের এই জয়যাত্রা অব্যাহত থাকুক, উত্তর জনপদ ছাড়িয়ে পুরো বাংলাদেশের প্রতিটি বঞ্চিত মানুষের মুখে হাসি ফোটাক—এই শুভকামনা রইল।