
— জসীমউদ্দীন ইতি হরিপুর ফিরে।
রাজনীতিতে অনেক সময় হাজারো চিৎকারের চেয়ে একটি ‘নীরবতা’ বেশি শক্তিশালী এবং অর্থবহ হয়ে ওঠে। ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলা বিএনপির বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ঠিক সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে। উপজেলা বিএনপির সভাপতিসহ ৯ জন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক মামলার ঘটনায় পুরো এলাকায় যখন তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হওয়ার কথা, তখন দলের ভেতরকার এক অভূতপূর্ব ও রহস্যময় ‘নিস্তব্ধতা’ জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। মামলার আইনি দিক বা অভিযোগের সত্যতা ছাপিয়ে এখন বড় আলোচনা হয়ে দাঁড়িয়েছে—দলের অভিভাবক ও শীর্ষ নেতাদের এই অস্বাভাবিক মৌনতা।
বর্তমান যুগ ডিজিটাল বিপ্লবের। রাজনীতির মাঠ এখন কেবল রাজপথে সীমাবদ্ধ নয়, বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও প্রতিবাদের একটি বড় প্ল্যাটফর্ম। যেকোনো রাজনৈতিক ইস্যু বা নেতাকর্মীদের ওপর মামলার ঘটনায় ফেসবুক যেখানে সংহতি ও প্রতিবাদের প্রধান হাতিয়ার হয়ে ওঠে, সেখানে হরিপুর উপজেলা বিএনপির চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। আশ্চর্যের বিষয় হলো, ঘটনার বেশ কয়েক দিন অতিবাহিত হলেও উপজেলা বা জেলা পর্যায়ের প্রভাবশালী কোনো নেতার ব্যক্তিগত প্রোফাইল বা দলীয় পেজে এই মামলা নিয়ে কোনো প্রতিবাদী পোস্ট দেখা যায়নি। এমনকি সাধারণ কোনো সংহতি প্রকাশও চোখে পড়েনি। এই ‘ডিজিটাল আকাল’ কি কেবলই কাকতালীয়, নাকি এর পেছনে কোনো সুগভীর রাজনৈতিক বিমুখতা লুকিয়ে আছে?
এই ঘটনার সবচেয়ে আলোচিত ও বিস্ময়কর দিক হলো ঠাকুরগাঁও-২ আসনের সংসদ সদস্য ডঃ আব্দুস সালামের রহস্যজনক নীরবতা। নিজের নির্বাচনী এলাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটের সভাপতির বিরুদ্ধে এমন গুরুতর মামলা হওয়া সত্ত্বেও তার পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি, প্রতিবাদ বা ন্যূনতম প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। একজন সংসদ সদস্য ও দলের জ্যেষ্ঠ নেতা হিসেবে তিনি তৃণমূলের কাছে একজন অভিভাবক সমতুল্য। কিন্তু সেই অভিভাবক যখন নিশ্চুপ থাকেন, তখন তৃণমূল কর্মীদের মাঝে চরম বিভ্রান্তি ও হতাশা ছড়িয়ে পড়া স্বাভাবিক। সাধারণ কর্মীদের মনে এখন প্রশ্ন—বিপদের দিনে যদি শীর্ষ নেতারা পাশে না দাঁড়ান বা একটি প্রতিবাদী শব্দও উচ্চারণ না করেন, তবে আগামীর রাজপথের লড়াইয়ে কর্মীরা কোত্থেকে সাহস পাবেন?
নীরবতার নেপথ্যে: সমীকরণ ও প্রশ্নসমূহ
রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, হরিপুর বিএনপির এই নীরবতার পেছনে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কারণ থাকতে পারে:
১. কৌশলগত পিছুটান: এটি কি কেবলই মামলার স্পর্শকাতরতা বা অভিযোগের ধরন বুঝে রাজনৈতিক কোনো সুনিপুণ কৌশল? নেতারা কি এখন চুপ থেকে আইনি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পর মোক্ষম সময়ে কথা বলবেন?
২. অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব: দলের চেইন-অফ-কমান্ড বা অভ্যন্তরীণ সমন্বয়ে কি কোনো বড় ধরনের ফাটল ধরেছে? হরিপুর বিএনপির ভেতরকার নেতৃত্বের কোন্দল কি এখন এতটাই প্রকট যে, নিজ দলের সভাপতির বিপদেও অন্য শীর্ষ নেতারা এগিয়ে আসতে কুণ্ঠাবোধ করছেন?
৩. অনাস্থার বহিঃপ্রকাশ: তৃণমূল পর্যায়ে গুঞ্জন উঠছে—এই নীরবতা কি সভাপতির প্রতি অন্য নেতাদের অলিখিত অনাস্থার বহিঃপ্রকাশ? দলের ভেতরেই কি কেউ কেউ এই পরিস্থিতিকে নেতৃত্বের পরিবর্তনের একটি বড় সুযোগ হিসেবে দেখছেন এবং মনে মনে খুশির হাওয়া বইছে?
নেতৃত্বের প্রতি অনাস্থা একবার তৈরি হলে তা মেরামত করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। হরিপুর উপজেলা বিএনপির এই ‘মৌনব্রত’ কেবল সভাপতির ব্যক্তিগত ইমেজ নয়, বরং পুরো সংগঠনের ঐক্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। যখন একজন নেতা মামলার জালে আটকা পড়েন, তখন সংগঠনের শক্তি হওয়া উচিত ছিল ইস্পাতকঠিন সংহতি। কিন্তু তার বদলে যখন ‘কৌশলী দূরত্ব’ তৈরি করা হয়, তখন সাধারণ ভোটার ও সমর্থকদের কাছে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়।
রাজনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী নীরবতা অনেক সময় বড় কোনো ঝড়ের পূর্বাভাস দেয়। হরিপুর বিএনপির এই নিস্তব্ধতা কি কোনো বড় ধরনের ভাঙন বা পরিবর্তনের সুর বাজাচ্ছে? নাকি এটি কেবলই সাময়িক অস্থিরতা? রাজনীতি কেবল ক্ষমতার লড়াই নয়, এটি ত্যাগের দিনে এবং সংকটের সময়ে একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর একটি দায়বদ্ধতাও। হরিপুরের এই নিস্তব্ধতা শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নেয়, তা সময়ই বলে দেবে। তবে ডঃ আব্দুস সালামসহ শীর্ষ নেতাদের এই নীরবতা যদি আরও দীর্ঘ হয়, তবে তা ঠাকুরগাঁও-২ আসনের রাজনৈতিক সমীকরণকে ওলটপালট করে দিতে পারে।