
মো.সামসুদ্দিন সাহেদ
মঞ্চে দাঁড়িয়ে যখন বইটা হাতে নিয়েছিলাম, তখনো জানতাম না এই একটি বইয়ের মলাট আমার ভেতরে এক নতুন সত্তাকে জাগিয়ে তুলবে। ২০২৪ সালের আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে ফেনী জেলা প্রশাসন আয়োজিত অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসন থেকে পেয়েছিলাম একটি বই, বইটির নাম ‘একুশে ফেব্রুয়ারির আন্দোলন’। লেখক, অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক। প্রচ্ছদ পেরিয়ে ভেতরের পাতায় যখন ডুব দিলাম, তখন বইয়ের প্রতিটি লাইন আমার মনের ভেতর গিয়ে আছড়ে পড়তে লাগল। কী ক্ষুরধার লেখনী, কী গভীর দেশপ্রেম! বইটির শেষ পাতা যতক্ষণে বন্ধ করলাম, ততক্ষণে লেখকের প্রতি এক অদ্ভুত, অলীক ভালোবাসায় জড়িয়ে গেছি আমি। মনে মনে এক অবাধ্য ইচ্ছে ডানা মেলল,যদি কখনো এই মানুষটার মুখোমুখি দাঁড়াতে পারতাম! কিন্তু ঢাকার সেই মস্ত বড় অধ্যাপক আর ফেনীর এক সাধারণ তরুণ এদের দূরত্ব তো চাট্টিখানি কথা নয়। তাই ইচ্ছেটাকে অলীক কল্পনা ভেবেই মনের এক কোণে জমিয়ে রেখেছিলাম।
সময় তার আপন গতিতে বয়ে চলে। দেখতে দেখতে ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে এলো ২০২৬ সালের ২৩শে মে। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মবার্ষিকীতে বাংলা একাডেমির এক সেমিনারে অংশ নেওয়ার সুযোগ হলো। মিলনায়তনে ঢুকে দেখি ব্যানারে বিভিন্ন আলোচকদের নামের পর লেখা সভাপ্রধান অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক। তখন একমুহূর্তেই মনের ভেতর আনন্দের এক তীব্র হিল্লোল বয়ে গেল।
অনুষ্ঠানের শেষভাগে তিনি যখন মঞ্চে দাঁড়ালেন বক্তব্য দেওয়ার জন্য, পুরো হলজুড়ে নেমে এলো পিনপতন নীরবতা। মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে রইলাম তাঁর দিকে। ২০১৫ সালে নিজের একমাত্র পুত্রকে হারিয়েছেন, বুকভরা সেই তীব্র শোক আর একাকীত্ব নিয়েও মানুষটি দমে যাননি। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এই জাতির জন্য, আমাদের মতো তরুণদের জন্য নিজের সবটুকু উজাড় করে দিয়ে গেছেন। তাঁর প্রতিটি কথায় মিশে ছিল এক অদ্ভুত মায়াজাল। আমি কেবল শুনছিলাম আর ভাবছিলাম, মানুষ এতটা ঋজু, এতটা আলোকময় হয় কী করে! তখনো কি জানতাম, এই প্রথম দেখাই হবে শেষ দেখা?
সেমিনার শেষ হলো। মঞ্চ থেকে তিনি যখন নেমে আসছিলেন, আমি তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। আমতা আমতা করে একটা ছবি তোলার আবদার করতেই এক চিলতে মায়াবী হাসি ছড়িয়ে পড়ল তাঁর সমস্ত মুখে। কোনো ক্লান্তি নেই, কোনো অহংকার নেই, পরম মমতায় সম্মতি দিলেন। ক্যামেরার এক ক্লিকেই ফ্রেমবন্দী হয়ে রইল আমার জীবনের শ্রেষ্ঠতম মুহূর্তটি।
ছবি তোলা শেষ হতেই তিনি আমার দিকে তাকিয়ে স্বভাবসুলভ আদুরে গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “বাড়ি কোথায় তোমার?”
আমি বিনীতভাবে বললাম, “জ্বী স্যার, ফেনী।”
“কোন থানা?”
“দাগনভূঁঞা।”
আমার জবাব শুনে প্রবীণ এই প্রাবন্ধিকের চোখ দুটি উজ্জ্বল হয়ে উঠল। স্মিত হেসে চট করে প্রশ্ন করলেন, “কবি জাকির আবু জাফরের উপজেলা?”
আমি একটু লজ্জিত হয়ে সংশোধন করে দিয়ে বললাম, “না স্যার, ওনার সোনাগাজী উপজেলা। আমাদের পার্শ্ববর্তী উপজেলা।”
আমার কথা শুনে তিনি এত সুন্দর করে প্রাণখোলা এক টুকরো হাসি হাসলেন, যা আজও আমার চোখে ভাসে। এরপর আমার কাঁধে হাত রেখে পরম স্নেহে জীবনের সবচেয়ে বড় এবং অমূল্য উপদেশটি দিলেন, “বেশি বেশি করে পড়ো, কম কম লেখো। যা পড়বে, তার চারভাগের একভাগ লিখবে।”
এত বড় একজন মানুষ, অথচ কত অনায়াসে আমার মতো এক নগণ্য তরুণের সাথে মিশে গেলেন, যেন কতকালের চেনা! ওনার সেই সহজ-সরল রূপটি আমার হৃদয়ে চিরদিনের জন্য খোদাই হয়ে রইল।
বেশিদিন কাটেনি এর পর। ৫ই জুলাই, ২০২৬ তারিখে তিনি এই নশ্বর দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে পাড়ি জমিয়েছেন ওপারে। আজ তিনি নেই, কিন্তু রেখে গেছেন তাঁর সেই কালজয়ী সৃষ্টি আর আমার মতো হাজারো তরুণের বুকে জ্বালিয়ে দেওয়া পরম এক দীক্ষা। আমার স্মৃতির অ্যালবামের সেই ছবিটি আর তাঁর দেওয়া ওই চারভাগের একভাগ লেখার অমর বাণীটি আজীবন আমার জীবনের পথচলার পাথেয় হয়ে থাকবে। হে প্রিয় শিক্ষক, হে জ্ঞানতাপস, ওপারে ভালো থাকুন। আপনার স্মৃতির প্রতি জানাই আমার বিনম্র শ্রদ্ধা।
লেখক : প্রাবন্ধিক, দাগনভূঁঞা ফেনী।