
এম.নিজাম উদ্দীন মজুমদার সজিব, সংবাদদাতা:
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার দায়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। একই মামলায় সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন রাজসাক্ষী হিসেবে সত্য উন্মোচন করায় তাকে লঘু দণ্ড হিসেবে ৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ১৭ নভেম্বর ২০২৫ সোমবার দুপুর ১২টা ৩৪ মিনিট থেকে শুরু করে বেলা পৌনে তিনটা পর্যন্ত ৪৫৩ পৃষ্ঠার রায়ের সারসংক্ষেপ পাঠ ও দণ্ড ঘোষণা করেন ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদার।
বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল এই ঐতিহাসিক রায় প্রদান করেন। বেঞ্চের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। রায়ে উল্লেখ করা হয়, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আনীত তিনটি অভিযোগই রাষ্ট্রপক্ষ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম অভিযোগে তাকে আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং দ্বিতীয় ও গুরুতর অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়। আদালত পর্যবেক্ষণে জানায়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে। চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন নিজের দোষ স্বীকার করে এবং রাজসাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়ে সত্য উদ্ঘাটনে সহায়তা করায় তার সাজা কমিয়ে ৫ বছর করা হয়েছে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো সরকারের সর্বোচ্চ পদে থাকা কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে গণহত্যার দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার সম্পন্ন হলো। রায় ঘোষণার সময় রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে স্থাপিত বড় পর্দায় এবং বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ বিভিন্ন বেসরকারি সংবাদমাধ্যমে বিচারিক কার্যক্রম সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। উল্লেখ্য, দণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন। অন্যদিকে, চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন আটক অবস্থায় বিচারিক প্রক্রিয়ায় অংশ নেন।
এই ঐতিহাসিক রায় প্রদানকারী আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তুজা মজুমদার বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের একজন বিচারক। তার পৈতৃক নিবাস ফেনী জেলার ফুলগাজী উপজেলার আনন্দপুর ইউনিয়নের হাসানপুর মজুমদার বাড়িতে। ১৯৬০ সালের ১৫ জানুয়ারি জন্মগ্রহণকারী এই অভিজ্ঞ বিচারক ১৯ বছর জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে ২০১৯ সালের ১৪ জানুয়ারি অবসর গ্রহণ করেন। তিনি ১৯৮২ সালে বিসিএস উত্তীর্ণ হয়ে ১৯৯৩ সালে বিচার বিভাগে যোগদান করেন। এর আগে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি ও এলএলএম ডিগ্রি অর্জন করেন।
গত ৮ অক্টোবর ২০২৪ তারিখে সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শক্রমে হাইকোর্ট বিভাগের দুজন বিচারপতি এবং একজন অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজকে নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করা হয়। আইন ও বিচার বিভাগের সচিব শেখ আবু তাহের স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩-এর ধারা ৬-এর প্রদত্ত ক্ষমতাবলে বিচারপতি গোলাম মর্তুজা মজুমদারকে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
এদিকে রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যানের গ্রামের বাড়ি ফেনীর ফুলগাজীতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। রায় ঘোষণার দিন সকাল থেকেই হাসানপুর মজুমদার বাড়িতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। ফুলগাজী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ লুৎফর রহমান নিশ্চিত করেছেন যে, বিচারপতির বাড়িতে বিশেষ নজরদারির পাশাপাশি সার্বক্ষণিক পুলিশি পাহারা বসানো হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।