ফেনীতে ভিডিও ধারণ করে বিদেশে পাঠানোর শর্তে বাসে আগুনের চেষ্টা

নিজস্ব সংবাদদাতা:

ফেনী জেলাজুড়ে বড় ধরনের নাশকতার পরিকল্পনা, মহাসড়কে বাসে অগ্নিসংযোগের চেষ্টা এবং নিষিদ্ধ সংগঠনের পক্ষে ঝটিকা মিছিলের প্রস্তুতিকালে বিশেষ অভিযান চালিয়ে ৯ জন যুবককে আটক করেছে পুলিশ। রবিবার ১৬ নভেম্বর ২০২৫ দিবাগত রাত ও সোমবার ১৭ নভেম্বর ২০২৫ এর প্রথম প্রহরে ফেনী সদর উপজেলার লালপোল, লেমুয়া ও মহিপাল এলাকায় পৃথক তিনটি অভিযানে তাদের আটক করা হয়। পুলিশের এই তড়িৎ তৎপরতায় দক্ষিণ আফ্রিকা প্রবাসী এক ব্যক্তির অর্থায়নে মহাসড়কে বাসে আগুন দিয়ে সেই ভিডিও বিদেশে পাঠানোর এক ভয়াবহ পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে। অভিযানে আটকদের কাছ থেকে দাহ্য পদার্থ, দেশীয় অস্ত্র ও নাশকতার সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে।

​ফেনী জেলা পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমানের সার্বিক দিকনির্দেশনায় পরিচালিত এই অভিযানে জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার গভীর ষড়যন্ত্র উন্মোচিত হয়েছে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সোমবার ১৭ নভেম্বর ২০২৫ রাত আনুমানিক ১টা ৩০ মিনিটের দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের লালপোল বাজারস্থ জাকিয়া হোটেলের সামনে সন্দেহজনকভাবে ঘোরাঘুরির সময় দুই যুবককে আটক করে পুলিশ। আটককৃতরা হলো—সোনাগাজী উপজেলার কুঠিরহাট দুর্গাপুর এলাকার ইউসুফের ছেলে আব্দুল্লাহ আল মাসুম (২২) এবং একই উপজেলার বিষ্ণুপুর এলাকার মো. নাছির উদ্দিনের ছেলে মো. রাজু (২০)।

​ঘটনাস্থলে আটকদের দেহ তল্লাশি করে পুলিশ অভিনব কায়দায় লুকানো নাশকতার সরঞ্জাম উদ্ধার করে। তাদের প্যান্টের কোমরে লুকানো অবস্থায় প্লাস্টিকের বোতলভর্তি কেরোসিন ও পেট্রোল এবং পকেটে গ্যাস লাইটার ও কসটেপ পাওয়া যায়। আটকের পর তারা পুলিশকে জানায়, সোনাগাজী এলাকার বাসিন্দা দক্ষিণ আফ্রিকা প্রবাসী রাজু নামের এক ব্যক্তি তাদের মুঠোফোনে নির্দেশনা দিয়েছিল। নির্দেশনা অনুযায়ী, লালপোল এসে যেকোনো একটি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে আলাউদ্দিন নাছিমের পক্ষে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিতে হবে এবং সেই দৃশ্য ভিডিও করে পাঠাতে হবে। এই কাজের বিনিময়ে তাদের যেকোনো চাহিদা পূরণের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। প্রবাসী রাজু এই নাশকতার জন্য বিকাশের মাধ্যমে তেল ক্রয় ও যাতায়াত বাবদ অগ্রিম টাকাও পাঠায়। আটককৃতরা তাদের অপর তিন সহযোগীকে নিয়ে লালপোলে দাঁড়িয়ে থাকা বাস বা কাভার্ডভ্যানে আগুন দেওয়ার জন্য ওত পেতে ছিল, কিন্তু পুলিশের টহল জোরদার থাকায় তারা সফল হতে পারেনি। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে তাদের সাথে থাকা অন্য তিনজন পালিয়ে যায়।

​এর আগে, রবিবার ১৬ নভেম্বর দিবাগত রাত ১২টা ৫ মিনিটের দিকে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ফেনী মডেল থানাধীন লেমুয়া বাজারে অভিযান চালায় পুলিশ। সেখানে নিষিদ্ধ সংগঠনের পক্ষে মিছিলের প্রস্তুতি নেওয়ার সময় তিনজনকে আটক করা হয়। আটককৃতরা হলো—ফেনী সদরের নেওয়াজপুর ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের কাজী বাড়ির নুরুল আমিনের ছেলে রাকিবুল ইসলাম (২১), একই গ্রামের তমিজ উদ্দিন ভূঁঞা বাড়ির নূর করিমের ছেলে মো. নাহিদ (২২) এবং হাজী বাড়ির মমিনুল হকের ছেলে মো. আশরাফুল হক (২১)। পুলিশ নিশ্চিত করেছে, আটককৃতরা বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মহাসড়কে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির লক্ষ্যে সমবেত হয়েছিল। স্থিরচিত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, তারা ইতিপূর্বে ফেনী শহরে নিষিদ্ধ সংগঠনের মিছিলে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিল।

​অন্যদিকে, টাকার বিনিময়ে বহিরাগতদের দিয়ে নাশকতা করানোর প্রমাণও পেয়েছে পুলিশ। সোমবার ১৭ নভেম্বর রাত ২টা ২০ মিনিটের দিকে শহরের মহিপাল এলাকায় সন্দেহজনকভাবে ঘোরাফেরা করার সময় ঢাকার লালবাগ ও কেরানীগঞ্জ এলাকা থেকে আসা চার কিশোরকে আটক করা হয়। আটককৃতরা হলো—ঢাকার লালবাগ থানার শহীদনগর এলাকার আনোয়ারের ছেলে মো. জিসান (১৯), একই এলাকার ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের আনোয়ার হোসেনের ছেলে ফারদিন ইসলাম (১৮), কেরানীগঞ্জের আব্দুল্লাহপুর এলাকার মৃত আনোয়ারা হোসেনের ছেলে মো. সোহেল (১৮) এবং লালবাগের শহীদনগরের সাইফুলের ছেলে সিরাম (১৮)। জিজ্ঞাসাবাদে তারা স্বীকার করে, দাগনভূঁঞা থানার ইমন নামের এক ব্যক্তি পূর্ব পরিচয়ের সূত্র ধরে টাকার বিনিময়ে তাদের ফেনীতে নিয়ে আসে। উদ্দেশ্য ছিল নিষিদ্ধ সংগঠনের পক্ষে মিছিলে অংশ নেওয়া এবং নাশকতা সৃষ্টি করা। তারা মহিপালে ইমনের জন্য অপেক্ষা করছিল, কিন্তু পুলিশ তাদের আটক করার পর থেকে ইমনের মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

​আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছে, আটককৃত ও পলাতক ব্যক্তিরা প্রবাসী ও দেশীয় মদদাতাদের অর্থায়নে জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করার গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনি কার্যক্রম চলমান রয়েছে। পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে জেলা পুলিশের বিশেষ টিম নাশকতা রোধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে।

এ রকম আরো সংবাদ

আমাদের সাথে থাকুন

0FansLike
0SubscribersSubscribe

সর্বশেষ সংবাদ