শাহীন সুলতানা, কুলিয়ারচর (কিশোরগঞ্জ)
কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর-মানিকদী সংযোগ জিল্লুর রহমান সেতু এলাকায় আবারও এক স্কুল ছাত্রী অপহরণ ও যৌন নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। গত ১৯ এপ্রিল রোববার দুপুরে ঘুরতে আসা এক স্কুল ছাত্রীকে তার প্রেমিকের কাছ থেকে অস্ত্রের মুখে ছিনিয়ে নিয়ে দীর্ঘ সময় আটকে রেখে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে একটি সংঘবদ্ধ দুষ্কৃতকারীদের বিরুদ্ধে ।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দুপুরের দিকে ওই কিশোরী তার প্রেমিকের সঙ্গে সেতু এলাকায় অবস্থান করছিল। এসময় অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে প্রেমিককে মারধর করে তার কাছ থেকে মোবাইল ফোন ছিনতাই করা হয়। পরে ওই ছাত্রীকে জোরপূর্বক একটি নির্জন বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাকে প্রায় ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা আটকে রেখে যৌন নির্যাতন করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে নির্যাতনের ভিডিও ধারণ করা হয়েছে, যা পরবর্তীতে ব্ল্যাকমেইলের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
নির্যাতনের শিকার ওই স্কুল ছাত্রীর বাড়ি বাজিতপুর উপজেলার সরারচর মাছিমপুর এলাকায় বলে জানান যায়।
ঘটনার পর ভুক্তভোগীর প্রেমিক স্থানীয় কয়েকজন যুবকের সহায়তায় উদ্ধার হয়। পরে মো. তামিম নামে এক অভিযুক্তকে তার বাড়ি থেকে আটক করে স্থানীয়রা। এসময় ছিনতাই হওয়া মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয় এবং মেয়েটিকে উদ্ধার করে পরিবারের কাছে পাঠিয়ে দেয়। আটককৃত অভিযুক্ত মো. তামিম কুলিয়ারচর পৌর সদর চারারবন মহল্লার মৃত ফরিদ উদ্দিনের ছেলে। পরে তাকে কুলিয়ারচর থানা পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়।
এ ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, সেতু ও আশপাশের এলাকা দীর্ঘদিন ধরে অপরাধপ্রবণ হয়ে উঠেছে এবং প্রায় একই কৌশলে একের পর এক ঘটনা ঘটছে।
উল্লেখ্য, গত ৭ ফেব্রুয়ারি একই এলাকায় ঘুরতে আসা এক দম্পতির সাথেও একই ধরনের ঘটনা ঘটে। অভিযোগ রয়েছে, স্বামীর কাছ থেকে স্ত্রীকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে দীর্ঘ সময় আটকে রেখে ধর্ষণ করা হয় এবং পরে তাকে তুলে নেওয়া স্থানেই ছেড়ে দেওয়া হয়। ভুক্তভোগীর বাড়ি ভৈরব এবং তার স্বামীর বাড়ি কটিয়াদীতে বলে জানা গেছে। মানসম্মানের ভয়ে তারা তখন কোনো অভিযোগ করেননি।
স্থানীয়দের দাবি, এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। একটি সংঘবদ্ধ চক্র নিয়মিতভাবে এই এলাকায় আসা প্রেমিক-প্রেমিকা ও দম্পতিদের টার্গেট করছে। অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে পুরুষ সঙ্গীকে আলাদা করে নারীদের নির্জন স্থানে নিয়ে নির্যাতন করে আসছে। এমন একাধিক অভিযোগ উঠেছে।
এলাকাবাসীর মতে, এমন ঘটনা প্রায়ই ঘটলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ করা হয় না। এর প্রধান কারণ মানসম্মানের ভয় এবং সামাজিকভাবে নির্যাতিত নারীকে হেয়প্রতিপন্ন করার প্রবণতা। অনেক ক্ষেত্রে কিশোরীরা প্রেমিকের সঙ্গে পরিবারকে না জানিয়ে ঘুরতে এসে এসব ঘটনার শিকার হয়। বিষয়টি পরিবার জানলে তারা আরও সমস্যায় পড়বে- এই আশঙ্কায় তারা নীরব থাকে।
স্থানীয়রা জানান, এসব নানাবিধ ভয় ও সামাজিক চাপে ভুক্তভোগীরা কোথাও কোনো অভিযোগ না করে আড়ালে চলে যায়। অনেকেই “প্রাণে বেঁচে ফিরেছি”- এই সান্ত্বনা নিয়েই চুপ থাকে। ফলে অপরাধীরা থেকে যায় ধরা-ছোঁয়ার বাইরে এবং একই ধরনের অপরাধ বারবার ঘটার সুযোগ পায়।
এলাকাবাসীর ভাষ্য, দিনের বেলাতেই এমন ঘটনা ঘটায় সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। সামাজিক ও পারিবারিক কারণে অনেক ভুক্তভোগী অভিযোগ না করায় প্রকৃত ঘটনার সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক এই ঘটনার পর স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বেড়েছে। তারা দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত, জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং সেতু এলাকায় স্থায়ী নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের দাবি জানিয়েছেন।