খুলনায় স্বামীর মৃত্যু কুমিরের পেটে, সন্তানের জন্মে অশ্রু-হাসির মিশেল মুন্নীর জীবনে

রাসেল আহমেদ,খুলনা

 

সুন্দরবনের করমজল খালে কুমিরের আক্রমণে স্বামী হারানোর শোক এখনো তাজা। সেই শোকের মাঝেই সাত বছরের প্রতীক্ষার অবসান—কোলজুড়ে এসেছে এক পুত্রসন্তান। কিন্তু আনন্দের এই মুহূর্তেও যেন অপূর্ণতা—কারণ, সন্তানের জন্মের খবর শোনার মানুষটি আর নেই।
খুলনার দাকোপ উপজেলার পূর্ব ঢাংমারী এলাকার বাসিন্দা সুব্রত মণ্ডল (৩২) গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর সুন্দরবনে কাঁকড়া ধরে ফেরার পথে কুমিরের আক্রমণে নিহত হন। তার স্ত্রী মুন্নী খাঁ (মুন) তখন ছিলেন চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা।
স্বামীর মৃত্যুর ছয় মাস পর, গত ২০ মার্চ ঈদের আগের দিন প্রসবব্যথা উঠলে প্রথমে তাকে মোংলা এবং পরে খুলনায় নেওয়া হয়। সেখানেই অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে জন্ম নেয় তার ছেলে সন্তান। ২৩ মার্চ নবজাতককে নিয়ে ফিরে আসেন নানি অপর্ণা পাটোয়ারীর বাড়িতে—যেখানে এখনই তার আশ্রয়।
মুঠোফোনে কথা বলতে গিয়ে বারবার আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন মুন্নী। তিনি বলেন, “সাত বছরের অপেক্ষার পর ঘরে সন্তান এলো। কিন্তু যে মানুষটার সবচেয়ে আগে এই খবরটা শোনার কথা ছিল, সে তো আর নেই। আমার ছেলে তার বাবার মুখটাও দেখতে পারল না।”
তিনি জানান, ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন তারা। দুই ধর্মের পরিবার হওয়ায় শুরুতে সম্পর্ক সহজ ছিল না। প্রায় দুই বছর সংগ্রামের পর ধীরে ধীরে সব ঠিক হচ্ছিল। কিন্তু ঠিক তখনই এক নির্মম দুর্ঘটনায় সব শেষ হয়ে যায়।
সুব্রতদের বাড়ি থেকে সুন্দরবনের করমজল খালের দূরত্ব মাত্র দুই কিলোমিটার। প্রতিদিনের মতো সেদিনও সঙ্গীদের নিয়ে বনে গিয়েছিলেন তিনি। ফেরার পথে করমজল খাল সাঁতরে পার হওয়ার সময় কুমিরের আক্রমণের শিকার হন। প্রায় সাত ঘণ্টা পর গজালমারী এলাকা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
মুন্নীর জীবনের গল্প যেন শুরু থেকেই সংগ্রামের। মাত্র আট মাস বয়সে বাবাকে হারান। পরে মায়ের দ্বিতীয় বিয়ের পর বড় হয়েছেন নানির কাছে। সেই নানি এখন একটি ছোট চায়ের দোকান চালিয়ে সংসার চালান।
এখন মুন্নীর সামনে বড় দুটি দুশ্চিন্তা—স্বামীর রেখে যাওয়া প্রায় এক লাখ টাকার ঋণ এবং নবজাতক সন্তানের ভবিষ্যৎ। তবুও তিনি স্বপ্ন দেখেন, তার ছেলে ‘জঙ্গল’-নির্ভর জীবন নয়, লেখাপড়া করে অন্য পথ বেছে নেবে।
“আমি চাই না আমার সন্তান এই বিপদসংকুল পেশায় আসুক। সে লেখাপড়া শিখুক, মানুষের মতো মানুষ হোক”—দৃঢ় কণ্ঠে বলেন মুন্নী।
এদিকে সুন্দরবন-নির্ভর মানুষের জীবনযাত্রা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। সুন্দরবন ও বাংলাদেশ উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক সাংবাদিক শুভ্র শচীন বলেন, জীবিকার তাগিদে বনে গিয়ে বাঘ-কুমিরের আক্রমণে নিহত ব্যক্তিদের পরিবারগুলো চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটায়। অনেক ক্ষেত্রেই এসব পরিবারের নারীরা সমাজে অবহেলার শিকার হন।
সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, সুব্রত মণ্ডল বৈধভাবে কাঁকড়া আহরণে গিয়েছিলেন। তার পরিবারকে সরকারি সহায়তা হিসেবে তিন লাখ টাকার চেক দেওয়া হয়েছে। তবে অনুমতি ছাড়া বনে গেলে দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে কোনো সহায়তা পাওয়া যায় না।
বন বিভাগের তথ্য বলছে, বাংলাদেশ অংশের সুন্দরবনের আয়তন ৬০১৭ বর্গকিলোমিটার, যার প্রায় ৩১ শতাংশই জলভাগ। এখানে রয়েছে ১৩টি বড় নদী ও প্রায় ৪৫০টি খাল। বিশাল এই বনজীবনকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে উপকূলীয় মানুষের জীবিকা।
তবে বাস্তবতা কঠিন। মাছ ও কাঁকড়ার সংকট, বনজ সম্পদের ঘাটতি, দস্যুদের হুমকি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ—সব মিলিয়ে দিন দিন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে এই জীবন। অনেকেই পেশা বদলের চিন্তা করছেন, আবার কেউ কেউ বাধ্য হয়েই ঝুঁকির পথেই রয়ে যাচ্ছেন।
মুন্নীর জীবন যেন সেই বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি—শোক, সংগ্রাম আর একরাশ স্বপ্ন নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার গল্প।

এ রকম আরো সংবাদ

আমাদের সাথে থাকুন

0FansLike
0SubscribersSubscribe

সর্বশেষ সংবাদ