এক লিটার তেলের জন্য হাহাকার ও আমাদের যাপিত জীবনের অসহায়ত্ব

জসীমউদ্দিন ইতি

 

ঠাকুরগাঁওয়ের রাজপথে এখন এক অদ্ভুত ও করুণ দৃশ্য। কেউ দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন, কেউবা রাগে ক্ষোভে ফেটে পড়ছেন। কিন্তু সবচেয়ে বেশি যা চোখে পড়ছে তা হলো মানুষের চরম অসহায়ত্ব। তেলের জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো যেন আজ কোনো এক আদিম যুদ্ধের সৈনিক। কারো হাতে মোটরসাইকেলের খোলা ট্যাংকি, কেউবা মাইলের পর মাইল বাইক ঠেলে নিয়ে আসছেন পাম্পের উদ্দেশ্যে। দৃশ্যটি প্রথম দেখায় অবিশ্বাস্য মনে হলেও, এটিই এখন আমাদের ঠাকুরগাঁও জেলার রূঢ় বাস্তবতা।

গত কয়েকদিন ধরে জেলার ৩৭টি ফিলিং স্টেশনে যে নজিরবিহীন বিশৃঙ্খলা আমি সরেজমিনে দেখেছি, তা একজন সংবাদকর্মী হিসেবে আমাকে ব্যথিত করেছে। সদর উপজেলার ২৪টি পাম্প থেকে শুরু করে পীরগঞ্জ, রাণীশংকৈল, বালিয়াডাঙ্গী এবং আমার নিজ এলাকা হরিপুরের পাম্পগুলোতে এখন শুধুই ‘তেল নেই’ লেখা সাইনবোর্ডের রাজত্ব। প্রতিদিন প্রায় আড়াই থেকে তিন লাখ লিটার জ্বালানি তেলের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ এখন তলানিতে। কিন্তু আজ আমি কেবল একজন সাংবাদিকের তথ্য-উপাত্ত নিয়ে লিখতে বসিনি; আজ লিখছি একজন সাধারণ ভুক্তভোগী নাগরিকের জবানবন্দি হিসেবে।

ঈদুল ফিতরের আনন্দ যখন দুয়ারে কড়া নাড়ছে, যখন মানুষের নাড়ির টানে বাড়ি ফেরার কথা, প্রিয়জনদের সাথে ঈদ উদযাপনের প্রস্তুতি নেওয়ার কথা—ঠিক সেই মুহূর্তে আমরা তেলের জন্য পাম্পে পাম্পে এক অসম যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছি। ব্যক্তিগতভাবে আমার নিজের মোটরসাইকেলটি গত দুই দিন ধরে অচল হয়ে পড়ে আছে। একজন সংবাদকর্মী হিসেবে প্রতিদিন মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে তাদের সংকটের কথা শুনি, তাদের অভাব-অভিযোগ ক্যামেরাবন্দি করি। কিন্তু আজ নিজের এই সংকটের কথা বলতে গিয়ে এক অদ্ভুত সংকোচবোধ করছি। পাম্পগুলোতে তেলের জন্য যে নজিরবিহীন ভিড় আর হট্টগোল, সেই ভিড়ে মিশে গিয়ে এক লিটার তেলের জন্য লড়াই করার মতো মানসিক শক্তি বা ‘লজ্জাসরম’ কোনটিই আর অবশিষ্ট নেই। তাই ঘরের কোণে ধুলো জমা অবস্থায় পড়ে আছে আমার নিত্যদিনের সঙ্গী এই বাইকটি, যেমন থমকে গেছে হাজারো মানুষের ঈদের খুশি।

প্রশ্ন জাগে, এই সংকট কেন? চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম—এই গৎবাঁধা অজুহাত আমরা আর কতকাল শুনব? ঠাকুরগাঁও একটি কৃষিপ্রধান অঞ্চল। বর্তমানে একদিকে সেচ মৌসুম চলছে, অন্যদিকে আলুসহ অন্যান্য রবি শস্য পরিবহনের ব্যস্ত সময়। এর ওপর যোগ হয়েছে ঈদের বাড়তি চাপ। এই সন্ধিক্ষণে জ্বালানি তেলের এমন আকাল কেবল জনভোগান্তি নয়, বরং আমাদের আঞ্চলিক অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেওয়ার নামান্তর। কৃষি পণ্য পরিবহনে স্থবিরতা মানেই বাজারে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, যা সাধারণ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দিচ্ছে।

মানুষ বাধ্য হয়ে বাইকের বডি থেকে ট্যাংকি খুলে হাতে নিয়ে লাইনে দাঁড়াচ্ছে—এই চিত্র কি ডিজিটাল বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি হতে পারে? পাম্পগুলোতে মাঝেমধ্যেই উত্তেজনা ছড়াচ্ছে, সাধারণ মানুষের মধ্যে হাতাহাতি হচ্ছে—এসবই কি প্রশাসনিক নজরদারির অভাব নয়? আমরা কি তবে এভাবেই কোনো এক অন্ধকার গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছি, যেখানে তেলের মতো একটি মৌলিক চাহিদাও আজ সোনার হরিণ হয়ে দাঁড়িয়েছে?

জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আমার বিনীত আবেদন—ঠাকুরগাঁওয়ের এই তীব্র জ্বালানি সংকট সমাধানে দয়া করে জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ নিন। লজিস্টিক সাপ্লাই চেইন কেন ভেঙে পড়ল, কেন কোম্পানিগুলো সময়মতো তেল পাঠাচ্ছে না, তার সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। ঈদের আগে মানুষের মুখে হাসি ফেরাতে না পারলেও, অন্তত তাদের চলাচলের পথটুকু সচল রাখুন। আমরা চাই না তেলের লাইনে দাঁড়িয়ে কোনো বাবার ঈদের বাজার করার সময়টুকু নষ্ট হোক, কিংবা কোনো তরুণের ঈদ আনন্দ ধূলিসাৎ হোক।

লজ্জাটা আমার একার নয়, লজ্জাটা এই অব্যবস্থাপনার। আর ভোগান্তিটা আমাদের সবার। আশা করি, খুব দ্রুতই তেলের এই হাহাকার কাটবে এবং ঠাকুরগাঁওয়ের চাকা আবার সচল হবে।

এ রকম আরো সংবাদ

আমাদের সাথে থাকুন

0FansLike
0SubscribersSubscribe

সর্বশেষ সংবাদ