ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় আমাদের দায়বদ্ধতা

জসীমউদ্দিন ইতি ঠাকুরগাঁও।

 

ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈলে সম্প্রতি এক যুবকের কাণ্ডজ্ঞানহীন ফেসবুক মন্তব্যকে কেন্দ্র করে যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি আমাদের সামাজিক সহনশীলতা ও ডিজিটাল সচেতনতার অভাবের এক বড় সতর্কবার্তা। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্যের অভিযোগে পুলিশ দ্রুত অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠিয়েছে। প্রশাসনের এই তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় এবং জনমনে শান্তি বজায় রাখতে এটি অত্যন্ত জরুরি ছিল। তবে এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কেবল আইনি ব্যবস্থাই কি যথেষ্ট?

বাংলাদেশ একটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। যুগে যুগে এখানে সব ধর্মের মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বসবাস করে আসছে। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে প্রতিটি অর্জনে সব ধর্মের মানুষের রক্ত মিশে আছে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, ইদানীং একটি বিশেষ মহলের উস্কানি বা ব্যক্তিগত বিকৃতির কারণে সেই সম্প্রীতির মূলে কুঠারাঘাত করার চেষ্টা চলছে। রাণীশংকৈলের এই ঘটনাটি আবারও প্রমাণ করেছে যে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার করে কীভাবে মুহূর্তের মধ্যে একটি শান্ত জনপদে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা সম্ভব।

যেকোনো ধর্মের মহামানব, ধর্মীয় বিশ্বাস বা পবিত্র গ্রন্থ নিয়ে কটূক্তি করা কেবল ব্যক্তিগত অপরাধ নয়, এটি একটি জঘন্যতম সামাজিক অপরাধ। ইসলামের শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি কোটি কোটি মানুষের যে ভালোবাসা ও আবেগ, সেখানে আঘাত হানার অর্থ হলো জনশৃঙ্খলাকে হুমকির মুখে ঠেলে দেওয়া। কোনো বিবেকবান মানুষ অন্যের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়ে আনন্দ পেতে পারে না। যারা এই ধরনের হীন কাজে লিপ্ত হয়, তারা আদতে সমাজের শত্রু এবং তাদের কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম নেই।

আমাদের তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ আজ প্রযুক্তির নেশায় বুঁদ হয়ে থাকলেও এর সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন নয়। ইন্টারনেটে উস্কানিমূলক তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া বা অন্যের অনুভূতিতে আঘাত করা যে দণ্ডনীয় অপরাধ, তা অনেক সময় তারা উপলব্ধি করতে পারে না। অভিভাবক, শিক্ষক এবং সামাজিক ও ধর্মীয় নেতাদের দায়িত্ব হচ্ছে এই বিষয়ে সচেতনতা গড়ে তোলা। ডিজিটাল নিরাপত্তা ও শিষ্টাচার সম্পর্কে স্কুল-কলেজ পর্যায়ে ব্যাপক প্রচারণা চালানো এখন সময়ের দাবি।

একই সঙ্গে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে যাতে কোনো অপরাধীর ব্যক্তিগত অপকর্মের দায়ে পুরো একটি সম্প্রদায়ের ওপর ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ না ঘটে। অপরাধীর পরিচয় শুধুই ‘অপরাধী’। আইন তার নিজের গতিতে চলবে এবং অপরাধীকে কঠোরতম শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে—এটাই সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা। তবে সাধারণ মানুষকেও ধৈর্য ও সংযমের পরিচয় দিতে হবে। কোনো অবস্থাতেই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া যাবে না। উত্তেজিত হয়ে কোনো ভাঙচুর বা সহিংসতার পথ বেছে নিলে তা মূল উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করে এবং অশুভ শক্তিকে সুযোগ করে দেয়।

পরিশেষে আমরা বলতে চাই, ঠাকুরগাঁওসহ সারা দেশে সাম্প্রদায়িক ভ্রাতৃত্ব অটুট রাখা আমাদের জাতীয় দায়িত্ব। রাণীশংকৈলের এই ঘটনায় পুলিশ প্রশাসনের সক্রিয়তা যেমন কাম্য ছিল, তেমনি আগামীতে যাতে এমন কোনো উস্কানিমূলক কর্মকাণ্ড না ঘটে, সেদিকে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।

যারা সুপরিকল্পিতভাবে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ইন্টারনেটে বিষবাষ্প ছড়াচ্ছে, তাদের খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। ধর্ম যার যার, কিন্তু সম্প্রীতির এই দেশ আমাদের সবার। এই সত্যটি হৃদয়ে ধারণ করেই আমাদের সামনে এগোতে হবে।

এ রকম আরো সংবাদ

আমাদের সাথে থাকুন

0FansLike
0SubscribersSubscribe

সর্বশেষ সংবাদ