
সংবাদ প্রতিবেদন : মোহাম্মদ আবু দারদা।
ফেনীর প্রবীণ সাংবাদিক এবং ‘দৈনিক সুপ্রভাত ফেনী’র ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ফিরোজ আলম হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। শনিবার ২৮ মার্চ ২০২৬, দুপুর ১২টা ৪৭ মিনিটে রাজধানীর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে বয়স হয়েছিল ৬০ বছর। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাঁর মৃত্যুর আনুষ্ঠানিক নিবন্ধন নম্বর ২৭০/২৩৪৭০ ও মর্গের সিরিয়াল নম্বর ৯১৮। দাপ্তরিক প্রক্রিয়া হিসেবে ফেনী মডেল থানার বেতার বার্তা (নম্বর-২১২/২৬) এবং ডিএমপি শাহবাগ থানার বেতার বার্তা (নম্বর-৯৭৪/২৬) ও সাধারণ ডায়েরি (নম্বর-১৭৪৭) মূলে তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি আইনগতভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে।
উন্নত চিকিৎসার উদ্দেশ্যে শনিবার ২৮ মার্চ ২০২৬, সকাল অনুমান ৭টার দিকে ফেনীর নিজ বাড়ি থেকে ঢাকার জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের উদ্দেশে রওয়ানা হয়েছিলেন তিনি। পথিমধ্যে তিনি আকস্মিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরবর্তীতে রাজধানীর সায়েদাবাদের জনপদ মোড় এলাকা থেকে আনোয়ার নামের এক সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালক তাঁকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে পৌঁছানোর পর জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
১৯৬৬ সালের ১১ মার্চ জন্মগ্রহণ করা এই গুণী ব্যক্তিত্বের পৈতৃক নিবাস ফেনী পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের মধ্য বিরিঞ্চি এলাকার কদলগাজী সড়কের জিন্নাত আলী মজুমদার বাড়িতে। তাঁর পিতা মরহুম ব্যবসায়ী আহছান উল্ল্যা ছাদেক এবং মাতা মোছাঃ নুরের নাহার। শিক্ষাজীবনে তিনি বিরিঞ্চি আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ফেনী জি এ একাডেমি, ফেনী কলেজ এবং নোয়াখালী সরকারি কলেজের পাঠ চুকিয়ে সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। ব্যক্তিজীবনে তিনি স্ত্রী আমেনা জোহরা এবং দুই ছেলে ও এক মেয়ে রেখে গেছেন। পারিবারিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, রোববার ২৯ মার্চ ২০২৬ তারিখে সকাল ১১ টা তার জানাজা ও দাফন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে তিনি ব্যাংকিং এবং সাংবাদিকতা—উভয় ক্ষেত্রেই নিজের দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন। ১৯৯৩ সালে সোনালী ব্যাংকে কর্মজীবন শুরু করে ক্যাশিয়ার থেকে শুরু করে সর্বশেষ শাখা ব্যবস্থাপক হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন। সোনালী ব্যাংক ফেনীর প্রধান কার্যালয়, মহিপাল ও সদর উপজেলা শাখায় দীর্ঘ সময় নিয়োজিত থাকার পর ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি সরকারি চাকরি থেকে আনুষ্ঠানিক অবসর গ্রহণ করেন। এর পাশাপাশি নব্বইয়ের দশকে বাংলা ভাষার প্রথম কম্পিউটারাইজড পত্রিকা ‘আনন্দপত্র’ দিয়ে সংবাদ জগতে তাঁর পদচারণা শুরু হয়। পরবর্তীতে তিনি দৈনিক মিল্লাত, লাল সবুজ, কালবেলা এবং রূপালী পত্রিকায় ক্রীড়া প্রতিবেদক হিসেবে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে কাজ করেন।
পাক্ষিক ‘খেলা’ পত্রিকায় প্রতিবেদক ও নির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি দীর্ঘ সময় পাক্ষিক ‘ফেনীর চিত্র’ এবং জীবনের শেষভাগে ‘দৈনিক সুপ্রভাত ফেনী’র সম্পাদনায় নিরবচ্ছিন্নভাবে নিযুক্ত ছিলেন। সরকারি বিধিনিষেধের কারণে পত্রিকা দুটির প্রকাশকের দায়িত্বে তাঁর স্ত্রী থাকলেও সম্পাদনা ও পরিচালনার মূল কাজটি তিনি নিজেই করতেন। সংবাদপত্রের পাশাপাশি গবেষণাধর্মী লেখালিখিতেও তাঁর বিশেষ অবদান রয়েছে। দীর্ঘ তিন দশকের শ্রমে তিনি ফেনীর ইতিহাস, ঐতিহ্য, আউলিয়া পাগলা মিঞা (র.), শহীদ বুদ্ধিজীবী এবং ভাষা আন্দোলন নিয়ে অন্তত ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেন। ক্রীড়া সাংবাদিকতায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ ক্রীড়া লেখক সমিতি তাঁকে ‘বর্ষসেরা ক্রীড়া সাংবাদিক পুরস্কার-২০২২’ এ ভূষিত করে। তাঁর এই আকস্মিক মৃত্যুতে ফেনীর গণমাধ্যমকর্মী ও সুধীসমাজে গভীর শোক নেমে এসেছে।