জসীম উদ্দীন ইতি, ঠাকুরগাঁও
সারাদেশে চলমান জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট ও সরবরাহ নিয়ে টানাপোড়েনের এক ভিন্নধর্মী ও স্যাটায়ারধর্মী প্রতিফলন দেখা গেল ঠাকুরগাঁওয়ে। এক বিয়ের অনুষ্ঠানে বরকে উপহার হিসেবে দেওয়া হয়েছে ৫ লিটার অকটেন! যা উপস্থিত অতিথিদের মধ্যে হাস্যরস ও কৌতূহল সৃষ্টির পাশাপাশি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সম্প্রতি ঠাকুরগাঁও জেলার অধিকাংশ ফিলিং স্টেশনে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও মিলছে না প্রয়োজনীয় তেল। অধিকাংশ পাম্পে সীমিত সরবরাহ থাকায় সড়কজুড়ে তেলের জন্য যানবাহনের দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। এমন বাস্তবতায় সদর উপজেলার বেগুনবাড়ি ইউনিয়নের রাজাপুকুর এলাকায় এক বিয়ের অনুষ্ঠানে বরকে এই 'দামী' ও 'ব্যতিক্রমী' উপহার দেওয়া হয়।
তবে এই ভাইরাল নিউজের পেছনে বেরিয়ে এসেছে এক অন্যরকম তথ্য। জানা গেছে, চলমান এই সংকটকে প্রতীকীভাবে ফুটিয়ে তুলতে এবং জনসচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে ঠাকুরগাঁওয়ের কয়েকজন সাংবাদিক নিজেরাই এই উদ্যোগটি নিয়েছিলেন। তারা ৫ লিটার অকটেন কিনে বরের হাতে তুলে দিয়ে সংবাদের প্রেক্ষাপট তৈরি করেন, যা মুহূর্তেই ক্যামেরাবন্দি করা হয় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
এই অদ্ভূত অথচ বাস্তবধর্মী উপহারের বিষয়ে ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ মুঠোফোনে 'দৈনিক শিক্ষা ডটকম'-কে বলেন, জ্বালানি তেলের এই সংকট বর্তমান সময়ে একটি জাতীয় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিয়ের অনুষ্ঠানে বরকে অকটেন উপহার দেওয়ার বিষয়টি আমি শুনেছি। এটি যেমন হাস্যরসের সৃষ্টি করেছে, তেমনি বর্তমান পরিস্থিতির এক কঠিন বাস্তবতাকে সবার সামনে তুলে ধরেছে। বিশেষ করে সাধারণ মানুষ এবং শিক্ষার্থীদের যাতায়াতে যে ভোগান্তি হচ্ছে, তা সত্যিই চিন্তার বিষয়। আমি আশা করি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত এই সমস্যার সমাধান করবেন যাতে জনজীবন স্বাভাবিক হয়।
উপহার প্রদানকারী ব্যবসায়ী জহিরুল ইসলাম বলেন, পেট্রোল-অকটেন পাওয়া এখন সোনার হরিণ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও জ্বালানি মিলছে না, যার প্রভাব পড়ছে দৈনন্দিন কাজে। বর-কনে যেন যাতায়াতে কোনো ভোগান্তিতে না পড়েন, সেই চিন্তা থেকেই এই ৫ লিটার অকটেন উপহার দেওয়া। এটি মূলত চলমান সংকটের একটি প্রতীক।
বর রাতুল হাসান সাফি এই উপহার পেয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, "বিয়েতে অনেক উপহারই পেয়েছি, তবে এটি খুবই ব্যতিক্রমী। এই সংকটময় মুহূর্তে এটি আমার অনেক কাজে লাগবে। যারা এই ব্যতিক্রমী চিন্তা করেছেন, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা।
ঠাকুরগাঁওয়ের বিশিষ্টজন ও সচেতন নাগরিকরা বিষয়টিকে সৃজনশীল প্রতিবাদ হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, সংবাদের কাজ শুধু তথ্য দেওয়া নয়, সমাজের অসংগতিগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া। সাংবাদিকরা যে পদ্ধতিতে জ্বালানি সংকটকে তুলে ধরেছেন, তা একটি 'সফল স্যাটায়ার'। তবে সচেতন মহলের কেউ কেউ মনে করছেন, সংবাদের প্রয়োজনে পরিস্থিতি কৃত্রিমভাবে তৈরি করা সাংবাদিকতার নিরপেক্ষতাকে কিছুটা প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। যদিও তারা একমত যে, এটি কোনো অশুভ উদ্দেশ্যে নয় বরং জনস্বার্থেই করা হয়েছে।
জ্বালানি তেলের এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে এর প্রভাব সরাসরি পড়বে পরিবহন, কৃষি ও নিত্যপণ্যের বাজারে। ঠাকুরগাঁওয়ের এই 'অকটেন উপহার' যেমন আনন্দের খোরাক জুগিয়েছে, তেমনি নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি স্পষ্ট বার্তাও পৌঁছে দিয়েছে। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, দ্রুতই এই সংকট কাটিয়ে উঠবে দেশ।
জসীম উদ্দীন ইতি ঠাকুরগাঁও ০১৭৫১০৭৯৮২৩