জসিমউদ্দীন ইতি, ঠাকুরগাঁও
উত্তরের কৃষিপ্রধান জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে জাতীয় ফল কাঁঠালের গাছে গাছে এখন কচি মুচির সমারোহ। তবে মুচি আসার এই আনন্দ বিষাদে পরিণত হয়েছে জেলার শতশত বাগান মালিক ও কৃষকদের মাঝে। জেলায় ব্যাপকভাবে দেখা দিয়েছে কাঁঠালের ‘মুচি পচা’ রোগ। পচে যাওয়া মুচি ঝরে পড়ে গাছের তলা কালো হয়ে থাকছে, যা নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন বাগান মালিকরা।
সরেজমিনে জেলার পীরগঞ্জ উপজেলার পীরগঞ্জ সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠ প্রাঙ্গণে গিয়ে দেখা যায়, সেখানকার একটি বিশাল কাঁঠাল গাছের অধিকাংশ মুচি পচে কালো হয়ে ঝরে নিচে পড়ে আছে। একই চিত্র দেখা গেছে জেলার বিভিন্ন উপজেলার গ্রামগুলোতেও।
পীরগঞ্জ উপজেলার কৃষক খালেক ও বাবুল আক্ষেপ করে বলেন, গাছে এবার যে পরিমাণ মুচি এসেছিল, ভেবেছিলাম গত কয়েক বছরের লোকসান এবার পুষিয়ে নেব। কিন্তু চোখের সামনেই সব মুচি কালো হয়ে পচে যাচ্ছে। কীটনাশক দিয়েও কোনো কাজ হচ্ছে না।
একই উদ্বেগের কথা জানান রানীশংকৈল ও হরিপুর উপজেলার বাগান মালিক মামুন, লতিফ ও মাজেদুল। তারা বলেন, আমাদের এলাকার প্রায় সব গাছেই এই পচন দেখা দিয়েছে। বাগান লিজ নেওয়া ব্যবসায়ীরাও এখন লোকসানের ভয়ে আছেন। যদি দ্রুত এই পচন না থামে, তবে এবার বাজারে কাঁঠাল পাওয়াই দুষ্কর হবে।
উদ্ভিদ বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি একটি ছত্রাকজনিত রোগ যার বৈজ্ঞানিক নাম 'রাইজোপাস ফ্রুট রট' (Rhizopus Fruit Rot)। এই ছত্রাক কচি মুচিকে আক্রমণ করে। শুরুতে মুচির ওপর সাদা তুলার মতো আবরণ পড়ে এবং পরে তা দ্রুত পচে কালো বর্ণ ধারণ করে ঝরে পড়ে। অতিরিক্ত ঘন কুয়াশা, মেঘলা আকাশ এবং বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেড়ে গেলে এই রোগ মহামারি আকার ধারণ করে।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে ঠাকুরগাঁও জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (উদ্ভিদ সংরক্ষণ) কৃষিবিদ আলাউদ্দিন শেখ বলেন, আবহাওয়া পরিবর্তন এবং বাতাসে অতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে মূলত কাঁঠাল গাছে ছত্রাকজনিত এই রোগটি দেখা দিচ্ছে। আমরা কৃষকদের আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছি। এটি সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
তিনি আরও জানান, মাঠ পর্যায়ে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা বাগানীদের পরামর্শ দিচ্ছেন। আক্রান্ত মুচিগুলো দ্রুত সরিয়ে ফেলে অনুমোদিত ছত্রাকনাশক স্প্রে করলে বাকি ফলগুলো রক্ষা করা যাবে।
কৃষি বিভাগ থেকে বাগানীদের জন্য জরুরি কিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে:
পরিচ্ছন্নতা: আক্রান্ত মুচি গাছ থেকে পেড়ে দূরে সরিয়ে ফেলতে হবে বা মাটিতে পুঁতে ফেলতে হবে। নিচে পড়ে থাকা মুচিগুলো দ্রুত পরিষ্কার করতে হবে।
ছত্রাকনাশক: গাছে মুচি আসার পর এবং ফুল ফোটার আগে একবার এবং পরে একবার ছত্রাকনাশক (যেমন: ম্যানকোজেব বা প্রোপিকোনাজল গ্রুপের ওষুধ) প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম মিশিয়ে পুরো গাছে ভালোভাবে স্প্রে করতে হবে।
আলো-বাতাস: গাছের ভেতরের মরা ডালপালা ছেঁটে দিয়ে পর্যাপ্ত সূর্যালোক ও বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করতে হবে।
ঠাকুরগাঁওয়ের অর্থকরী ফসলগুলোর মধ্যে কাঁঠাল অন্যতম। সঠিক সময়ে প্রতিকার ব্যবস্থা গ্রহণ করে এই মহামারি রোধ করা না গেলে জেলার অর্থনীতিতে বড় প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।