জসিমউদ্দীন ইতি ঠাকুরগাঁও।
রাজনীতি কেবল ক্ষমতার সিঁড়ি নয়, বরং এটি ত্যাগ, তিতিক্ষা এবং জনমানুষের অধিকার আদায়ের এক নিরন্তর সংগ্রাম। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন কিছু ব্যক্তিত্ব রয়েছেন, যাঁরা পদের চেয়ে আদর্শকে এবং ব্যক্তিস্বার্থের চেয়ে দলকে বড় করে দেখেছেন। ঠাকুরগাঁও জেলার রাজনীতিতে এমনই এক উজ্জ্বল নক্ষত্র ও লড়াকু সৈনিকের নাম জেড মর্তুজা চৌধুরী তুলা। দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে রাজপথের ধুলোবালি, জেল-জুলুম আর হুলিয়া মাথায় নিয়ে তিনি যে রাজনীতির চর্চা করেছেন, আজ সময় এসেছে সেই নিষ্ঠার সঠিক মূল্যায়নের। ঠাকুরগাঁও জেলা পরিষদের প্রশাসক হিসেবে তাঁর নাম আসা কেবল সময়ের দাবি নয়, বরং এটি তৃণমূলের দীর্ঘদিনের অবদমিত প্রত্যাশার এক জোরালো প্রতিফলন।
জেড মর্তুজা চৌধুরী তুলার রাজনৈতিক ভিত্তি রচিত হয়েছিল নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের অগ্নিগর্ভ রাজপথে। ঢাকা কলেজের ভিপি হিসেবে সেই উত্তাল সময়ে তিনি যে সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন, তা ঢাকার ছাত্ররাজনীতির ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে। সে সময় এরশাদবিরোধী আন্দোলনে রাজপথ কাঁপানো এই ছাত্রনেতা বারংবার স্বৈরশাসকের রোষানলে পড়েছেন, কিন্তু দমে যাননি। তাঁর সেই লড়াকু মানসিকতাই তাঁকে ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষের কাছে জনপ্রিয় করে তোলে।
১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি ঠাকুরগাঁও-২ আসন থেকে বিপুল ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তরুণ বয়সেই তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, তৃণমূলের মানুষের সাথে তাঁর নাড়ির টান কতটা গভীর। তবে ভাগ্যের এক নির্মম পরিহাস তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের নির্বাচনে আবারও দলীয় মনোনয়ন পেলেও, নির্বাচনের ঠিক আগে এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় তিনি গুরুতর আহত হন। টানা ২২ দিন সংজ্ঞাহীন অবস্থায় হাসপাতালের বিছানায় কাটানো সেই সময়টি ছিল তাঁর এবং তাঁর সমর্থকদের জন্য এক অগ্নিপরীক্ষা। সেই দুর্ঘটনায় তিনি প্রাণে বাঁচলেও নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি, যা ছিল ঠাকুরগাঁওবাসীর জন্য এক বড় শূন্যতা।
জেড মর্তুজা চৌধুরী তুলার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো তাঁর 'ত্যাগ'। ২০০১ সাল থেকে শুরু করে পরবর্তী প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনে তিনি দলীয় ও জোটগত স্বার্থে নিজের নিশ্চিত আসন বারবার ছেড়ে দিয়েছেন। অনেক বড় বড় নেতা যখন পদের জন্য দলবদল করেন বা বিদ্রোহী প্রার্থী হন, তখন তুলা ভাই দলের সিদ্ধান্তকে শিরোধার্য মেনে নিয়ে মাঠ পর্যায়ে কাজ করেছেন। ১৯৯৬ সাল থেকে আজ পর্যন্ত কাউকে তাঁর অবস্থান থেকে এক চুলও নড়াতে পারেনি কোনো প্রলোভন। এই যে ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দলের প্রতি অবিচল থাকা—এটি বর্তমান সময়ের সুবিধাবাদী রাজনীতিতে এক বিরল দৃষ্টান্ত।
রাজনীতি করতে গিয়ে তাঁকে সহ্য করতে হয়েছে অমানুষিক নির্যাতন। ১৯৯০ থেকে আজ পর্যন্ত অসংখ্য রাজনৈতিক মামলা, হামলা এবং দফায় দফায় কারাবরণ তাঁর নিত্যসঙ্গী ছিল। ওয়ান ইলেভেনের সময় থেকে শুরু করে পরবর্তী প্রতিটি সংকটে তিনি ছিলেন রাজপথের অগ্রসেনানি। সর্বশেষ ২৮ অক্টোবরের ঘটনার পর ঢাকার শ্যামলীর নিজ বাসা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠ তাঁকে ক্লান্ত করতে পারেনি, বরং তাঁর আদর্শিক অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করেছে।
কেন তিনি জেলা পরিষদের প্রশাসক হিসেবে অপরিহার্য?
ঠাকুরগাঁও জেলা পরিষদ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও উন্নয়নমূলক ইউনিট। এই প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে এমন একজনকে প্রয়োজন যিনি একদিকে যেমন প্রশাসনিক প্রজ্ঞার অধিকারী, অন্যদিকে যাঁর রয়েছে জনগণের সমস্যাগুলো সরাসরি বোঝার ক্ষমতা। জেড মর্তুজা চৌধুরী তুলা সেই যোগ্যতার মাপকাঠিতে অনন্য।
১. অভিজ্ঞ নেতৃত্ব: সাবেক সংসদ সদস্য হিসেবে প্রশাসনিক কাজের অভিজ্ঞতা তাঁর রয়েছে।
২. তৃণমূলের আস্থা: তিনি জেলার সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখের সাথে সরাসরি জড়িত।
৩. দুর্নীতিমুক্ত ভাবমূর্তি: দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো দুর্নীতির অভিযোগ ওঠেনি।
৪. বিপ্লবী চেতনা: বর্তমান সংস্কারমুখী প্রেক্ষাপটে এমন একজন সাহসী মানুষের প্রয়োজন যিনি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কাটিয়ে উন্নয়নকে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেবেন।
আমরা বিশ্বাস করি, রাষ্ট্র ও প্রশাসনের সংস্কারের এই মাহেন্দ্রক্ষণে বৈষম্য দূর করে যোগ্য ব্যক্তিকে সঠিক স্থানে বসানো জরুরি। "আর বৈষম্য নয়, যোগ্য ব্যক্তির মূল্যায়ন চাই"—এই স্লোগান এখন ঠাকুরগাঁওয়ের আনাচে-কানাচে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। জেড মর্তুজা চৌধুরী তুলার মতো একজন জনবান্ধব এবং পরীক্ষিত নেতাকে জেলা পরিষদের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হলে জেলার সার্বিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে। ত্যাগের মূল্যায়ন করা মানে কেবল একজন ব্যক্তিকে পুরস্কৃত করা নয়, বরং এটি ত্যাগী ও আদর্শিক রাজনীতির প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাকে পুনপ্রতিষ্ঠা করা।
আমরা আশা করি, নীতিনির্ধারক মহল তৃণমূলের এই প্রাণের দাবিকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করবেন এবং ঠাকুরগাঁও জেলা পরিষদকে এক নতুন ও গতিশীল নেতৃত্বের হাতে তুলে দেবেন।