জসীমউদ্দীন ইতি, ঠাকুরগাঁও।
প্রকৃতির রুদ্রমূর্তি কালবৈশাখী যখন উত্তরের জনপদে আঘাত হানে, তখন তা কেবল গাছপালা কিংবা ঘরবাড়ি লণ্ডভণ্ড করে না, বরং অনেক সময় নিভিয়ে দেয় কোনো পরিবারের শেষ আশার প্রদীপ। গত বৃহস্পতিবার রাতে ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার নেকমরদ ইউনিয়নের কুমারগঞ্জ গ্রামে যে মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটেছে, তা কেবল একটি সংবাদপত্রের শিরোনাম নয়, বরং আমাদের গ্রামীণ জনপদে অনিরাপদ আবাসন এবং প্রশাসনিক গাফিলতির এক করুণ উপাখ্যান। কালবৈশাখীর ঝড়ে ঘরের দেয়াল চাপা পড়ে তেরো বছর বয়সী কিশোর রেজোয়ান হোসেনের মৃত্যু আমাদের হৃদয়ে যে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছে, তা কি কেবল সমবেদনা দিয়ে মোছা সম্ভব?
নিহত রেজোয়ান ছিল তার বাবা তাহেরুল ইসলামের একমাত্র সন্তান। নেকমরদ আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের সপ্তম শ্রেণির এই মেধাবী ছাত্রটির চোখে ছিল রঙিন ভবিষ্যৎ। কিন্তু এক নিমিষেই সেই সব স্বপ্ন ধুলোয় মিশে গেল বসতঘরের জীর্ণ ইটের প্রাচীর ধসে। কালবৈশাখীর ঝড়ে টিনের চালা উড়ে যাওয়া কিংবা কাঁচা ও আধাপাকা ঘরের দেয়াল ধসে পড়া এ অঞ্চলে এক নিয়মিত বিয়োগান্তক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। প্রতি বছরই ঠাকুরগাঁওসহ উত্তরাঞ্চলে ঝড়ের মৌসুমে এমন প্রাণহানির সংবাদ আমাদের শুনতে হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আধুনিক প্রযুক্তির এই যুগেও কি আমরা গ্রাম পর্যায়ে এমন কোনো সাশ্রয়ী ও টেকসই আবাসন কাঠামো নিশ্চিত করতে পারছি না, যা অন্তত একটি মাঝারি মানের ঝড়ে মরণফাঁদে পরিণত হবে না?
এখানে একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আমাদের গ্রামীণ নির্মাণশৈলী এবং স্থানীয় নির্মাণ শ্রমিক বা রাজমিস্ত্রিদের কারিগরি দক্ষতা। ঠাকুরগাঁওয়ের গ্রাম পর্যায়ে অধিকাংশ ঘরবাড়ি নির্মিত হয় স্থানীয় রাজমিস্ত্রিদের হাত ধরে, যাদের অনেকেরই আধুনিক ও দুর্যোগসহনশীল নির্মাণ পদ্ধতি সম্পর্কে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান বা সরকারি প্রশিক্ষণ নেই। অনেক ক্ষেত্রে ইটের সঠিক গাঁথুনি না হওয়া, সিমেন্ট ও বালুর অনুপাত ঠিক না রাখা, কিংবা পিলারের যথাযথ বিন্যাস না বোঝার কারণে সামান্য ঝড়ের আঘাতেই দেয়ালগুলো তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। রেজোয়ানের মৃত্যু আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, স্থানীয় রাজমিস্ত্রিদের জন্য বিশেষ কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা এখন সময়ের দাবি। সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে যদি রাজমিস্ত্রিদের দুর্যোগসহনশীল ঘর তৈরির আধুনিক কলাকৌশল শেখানো যায় এবং ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে ন্যূনতম মানদণ্ড নিশ্চিত করা যায়, তবে অনেক মূল্যবান প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হবে।
একদিকে একটি পরিবারের অপূরণীয় শূন্যতা, অন্যদিকে রাণীশংকৈলসহ ঠাকুরগাঁওয়ের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের কৃষিখাতে কালবৈশাখীর ধ্বংসলীলা। কৃষিপ্রধান এই জেলায় ভুট্টা, আলু ও আমের মুকুলের যে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তাতে কৃষকের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। ঝড়ের আঘাতে শত শত বিঘা জমির ভুট্টা গাছ মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে। আমরা জানি, কৃষি বিভাগ ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে মাঠে নেমেছে। কিন্তু কেবল তালিকা প্রণয়ন আর ফাইলবন্দি আশ্বাসই কি যথেষ্ট? অতীতে দেখা গেছে, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের বদলে অনেক সময় সচ্ছল ব্যক্তিরা সরকারি প্রণোদনা পান। এবার যেন তার পুনরাবৃত্তি না হয়। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা যেন কোনো প্রকার প্রশাসনিক জটিলতা ছাড়াই সরাসরি সরকারি সহযোগিতা পায়, তা জেলা প্রশাসনকে কঠোরভাবে তদারকি করতে হবে।
ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসন, রাণীশংকৈল উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের প্রতি আমাদের সবিনয় আহ্বান—নিহত রেজোয়ানের শোকসন্তপ্ত পরিবারের পাশে কেবল মৌখিক নয়, বরং কার্যকর আর্থিক সহায়তা নিয়ে দাঁড়ান। ক্ষতিগ্রস্ত গৃহহীন পরিবারগুলোর দ্রুত পুনর্বাসনে উদ্যোগ নিন। পাশাপাশি, দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গ্রামীণ জনপদে নিরাপদ ঘরবাড়ি নির্মাণের সচেতনতা তৈরি করুন এবং স্থানীয় নির্মাণ শ্রমিকদের প্রশিক্ষণে বিশেষ প্রকল্প হাতে নিন।
প্রকৃতিকে রোধ করার সাধ্য মানুষের নেই, কিন্তু সঠিক পরিকল্পনা, দক্ষ জনশক্তি এবং আন্তরিক প্রশাসনিক তৎপরতা অন্তত শোকের মাতম কিছুটা হলেও কমাতে পারে। নিরাপদ আবাসন কি কেবল শহরের বিত্তবানদের অধিকার? গ্রামের সাধারণ মানুষের কি অধিকার নেই একটি ঝোড়ো রাতে নিশ্চিন্তে নিজের ঘরে ঘুমানোর? রেজোয়ানের মতো আর কোনো মা যেন তার একমাত্র সন্তানকে না হারায়—এটাই হোক আমাদের বর্তমানের শিক্ষা এবং আগামীর অঙ্গীকার।