জসীমউদ্দীন ইতি ঠাকুরগাঁও।
পবিত্র মাহে রমজান আমাদের মাঝে প্রতিবারই ফিরে আসে আত্মশুদ্ধি, সংযম আর ভ্রাতৃত্বের এক পরম সোপান হয়ে। রমজানের এই ত্যাগের মহিমা যখন কর্মব্যস্ত জীবনে প্রশান্তির ছোঁয়া দেয়, তখন তা হয়ে ওঠে অনন্য। সেই আধ্যাত্মিক আবহ আর পারস্পরিক সৌহার্দ্যের এক বিরল মেলবন্ধনে গত ১২ মার্চ ২০২৬, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ঠাকুরগাঁও পুলিশ লাইন্স প্রাঙ্গণ এক অপূর্ব মৈত্রীর আবহে সিক্ত হলো।
ঠাকুরগাঁও জেলা পুলিশের আয়োজনে এই ইফতার ও দোয়া মাহফিলটি ছিল যেন পেশাদারিত্বের কঠোর শৃঙ্খলার মাঝে এক পশলা মানবিক হৃদস্পন্দন।
ঠাকুরগাঁও জেলার সুযোগ্য পুলিশ সুপার জনাব মোঃ বেলাল হোসেন-এর অত্যন্ত সুচারু সভাপতিত্বে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে অনুষ্ঠানটির মাহাত্ম্য বহুগুণ বাড়িয়ে দেন রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি জনাব আমিনুল ইসলাম। প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি রমজানের ধৈর্য আর নৈতিকতার গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, "পুলিশ বাহিনীকে কেবল আইন প্রয়োগকারী সংস্থা হিসেবে নয়, বরং জনগণের আস্থার শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।" তাঁর এই বক্তব্য উপস্থিত প্রতিটি পুলিশ সদস্যের মনে জনসেবার এক নতুন সংকল্প জাগ্রত করে।
এই মাহফিলের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক ছিল পদমর্যাদার অদৃশ্য দেয়াল ভেঙে সবার এক কাতারে শামিল হওয়া। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন:
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ), ঠাকুরগাঁও।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস), ঠাকুরগাঁও।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল), ঠাকুরগাঁও।
সহকারী পুলিশ সুপার (রাণীশংকৈল সার্কেল), ঠাকুরগাঁও।
সহকারী পুলিশ সুপার (পীরগঞ্জ সার্কেল), ঠাকুরগাঁও।
সহকারী পুলিশ সুপার (শিক্ষানবিশ), ঠাকুরগাঁও।
এছাড়াও জেলার প্রতিটি থানা ও ইউনিটের প্রধানগণ এবং সাধারণ পুলিশ সদস্যরা কোনো বিভেদ ছাড়াই এক দস্তরখানে বসে ইফতার করেন। যখন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মাঠ পর্যায়ের সদস্যদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ইফতারে শরিক হন, তখন তা কেবল একটি ধর্মীয় রীতি থাকে না, বরং তা হয়ে ওঠে এক সুশৃঙ্খল পরিবারের অটুট বন্ধনের প্রতিচ্ছবি।
পুলিশের জীবন মানেই যেখানে চব্বিশ ঘণ্টা অতন্দ্র প্রহরীর মতো জনপদকে আগলে রাখা, উৎসবের দিনেও যারা পরিবারের মায়া ত্যাগ করে রাজপথে দায়িত্ব পালন করেন—তাদের জন্য এই আয়োজনটি ছিল এক বড় প্রশান্তি। ইফতারের ঠিক আগমুহূর্তে যখন মুয়াজ্জিনের আজানের ধ্বনি বাতাসের ঢেউয়ে ভেসে আসার প্রতীক্ষা, তখন সমগ্র পুলিশ লাইন্স চত্বরে নেমে আসে এক পিনপতন নীরবতা। হাজারো হাত একসাথে প্রসারিত হয় মহান রব্বুল আলামীনের দরবারে। বিশেষ মোনাজাতে কেবল নিজেদের জন্য নয়, বরং এই পলিবিধৌত ঠাকুরগাঁওয়ের শান্তি, দেশের সমৃদ্ধি এবং প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা ও সুস্বাস্থ্য কামনা করা হয়। সেই আবেগঘন মুহূর্তে সবার সমবেত 'আমিন' ধ্বনি আকাশ-বাতাসকে যেন পবিত্রতায় ভরিয়ে দেয়।
ঠাকুরগাঁও জেলা পুলিশের এই নান্দনিক ও সুশৃঙ্খল আয়োজন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, পুলিশ কেবল প্রশাসনের অংশ নয়, তারা সমাজেরই এক অবিচ্ছেদ্য প্রাণশক্তি। সাংবাদিকতার দৃষ্টি দিয়ে দেখলে বলতে হয়, এ ধরনের আয়োজন পুলিশ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে যে আস্থার সেতুবন্ধন তৈরি করে, তা একটি অপরাধমুক্ত ও শান্তিময় সমাজ গড়তে অত্যন্ত জরুরি।
জেলা পুলিশের এই আন্তরিক আতিথেয়তা আগামী দিনে পুলিশের ভাবমূর্তিকে আরও উজ্জ্বল করবে। সম্প্রীতির এই আলোয় আলোকিত হোক ঠাকুরগাঁওয়ের প্রতিটি অলিগলি, আর সেবার ব্রত নিয়ে এগিয়ে চলুক আমাদের গর্বের এই বাহিনী।