জসীমউদ্দীন ইতি ঠাকুরগাঁও।
আমি জসীমউদ্দীন ইতি সাংবাদিক দৈনিক শিক্ষা ডটকম অথবা ঠাকুরগাঁও জেলার শিক্ষা বিষয়ক সাংবাদিক হিসেবে দীর্ঘদিন যাবত কাজ করে আসছি । এই জনপদের ধুলোবালি মেখে বড় হওয়া একজন সাধারণ মানুষ। হরিপুরের সন্তান হিসেবে এই এলাকার মানুষের দীর্ঘশ্বাস আমি খুব কাছ থেকে অনুভব করি।
আজ আমার কলম কেবল সংবাদের জন্য নয়, আজ আমার কলম এক ঐতিহাসিক দাবির সপক্ষে। ঠাকুরগাঁওয়ের অবহেলিত অথচ সমৃদ্ধ জনপদ 'ভুল্লী' আজ পূর্ণাঙ্গ উপজেলা হওয়ার অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। আমি মনে করি, একজন সাংবাদিক এবং এই মাটির সন্তান হিসেবে এই দাবি আদায়ে সোচ্চার হওয়া আমার নৈতিক দায়িত্ব।
আমাদের মনে আজ এক গভীর শঙ্কা বাসা বেঁধেছে। আমরা স্পষ্ট বুঝতে পারছি, বর্তমান প্রশাসনিক প্রেক্ষাপটে যদি এই সরকারের আমলে ভুল্লী উপজেলা ঘোষিত না হয়, তবে আগামী কয়েকশ বছরেও আর এই লক্ষ্য পূরণ সম্ভব হবে না। আমলাতান্ত্রিক জটিলতার যে চক্র, তাতে একবার একটি দাবি হারিয়ে গেলে তা ফিরে পাওয়া দুষ্কর। তাই আমাদের সামনে এখন 'হয় এখন, নয়তো কখনোই নয়' (Now or Never) পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে।
তাই বলতে চাই, একটি জনপদের আত্মপরিচয়ের লড়াই-!
ঠাকুরগাঁও জেলার ইতিহাসে ভুল্লী এক প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী নাম। কিন্তু কালের পরিক্রমায় এই অঞ্চলটি অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে যতটা এগিয়েছে, প্রশাসনিকভাবে ততটাই যেন স্থবির হয়ে আছে। বড়গাঁও, বালিয়া, আউলিয়ারপুর, দেবীপুর ও শুকানপুকুরী— এই পাঁচটি ইউনিয়নের সমন্বয়ে গঠিত ভুল্লী থানা আজ কেবল একটি নাম নয়, এটি একটি অধিকার বঞ্চিত জনপদের নাম। দীর্ঘকাল ধরে এই অঞ্চলের মানুষ ‘ভুল্লী উপজেলা’র স্বপ্ন দেখে আসছে। আজ সেই স্বপ্ন আর কেবল ব্যক্তিগত চাওয়া নয়, বরং ১ লক্ষ ২৯ হাজার মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।
একটি থানাকে উপজেলায় উন্নীত করার জন্য সরকার যে সকল মানদণ্ড নির্ধারণ করেছে, ভুল্লী তার প্রতিটি শর্ত পূরণ করেছে অনেক আগেই। ৯টি বাণিজ্যিক ব্যাংক (সোনালী, জনতা, অগ্রণীসহ), ৪টি বিশাল হিমাগার, সরকারি খাদ্য গুদাম এবং একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ সাব-রেজিস্ট্রি অফিস ভুল্লীর অর্থনৈতিক সক্ষমতার প্রমাণ দেয়। ৫টি ইউনিয়ন ভূমি অফিস এবং ১টি সাব-পোস্ট অফিসের উপস্থিতি জানান দেয় যে, প্রশাসনিক কাঠামো এখানে আগে থেকেই বিস্তৃত। ব্যবসা-বাণিজ্যের কথা বললে, ঠাকুরগাঁও-পঞ্চগড় মহাসড়কের পার্শ্ববর্তী ভুল্লী বাজার আজ এই জেলার অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক প্রাণকেন্দ্র। অথচ, এই বিপুল উন্নয়নের পরেও সাধারণ মানুষকে জমি রেজিস্ট্রি বা ক্ষুদ্র প্রশাসনিক কাজের জন্য দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ঠাকুরগাঁও সদরে যেতে হয়, যা আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় এক চরম পরিহাস।
শিক্ষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে ভুল্লী পুরো ঠাকুরগাঁও জেলার জন্য এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এখানে সরকারি শিশু পরিবার (বালক), একটি সমৃদ্ধ ডিগ্রি কলেজ, কামিল মাদ্রাসা এবং ১০টি দাখিল/ফাজিল মাদ্রাসা রয়েছে। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, এখানে ১০৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ৪টি পাবলিক পরীক্ষা কেন্দ্র (এসএসসি, এইচএসসি ও মাদ্রাসা) রয়েছে। একটি পূর্ণাঙ্গ উপজেলা হওয়ার আগেই ভুল্লী যেভাবে শিক্ষার আলো ছড়িয়েছে, তা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। এ ছাড়া বালিয়া ঐতিহাসিক মসজিদ ও রাজা ভিরাটের মতো প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো এই এলাকাকে পর্যটন ও ঐতিহ্যের দিক থেকেও অনন্য করে তুলেছে।
ঠাকুরগাঁওয়ের মাটিতে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মতো ব্যক্তিত্বের জন্ম হওয়া একটি বিরল সৌভাগ্য। তিনি কেবল বিএনপির মহাসচিব নন, বরং এই অঞ্চলের প্রতিটি মানুষের ছায়া ও আশা-ভরসার স্থল। আমাদের উপলব্ধি করতে হবে, ফখরুল সাহেবের মতো ব্যক্তিত্ব বারবার জন্ম নেয় না। আর এমন একজন অভিভাবক পাশে থাকতেও যদি ‘ভুল্লী থানা’ পূর্ণাঙ্গ উপজেলায় রূপান্তরিত না হয়, তবে আগামী শত বছরেও তা হবে কি না— সেই সন্দেহ আজ অমূলক নয়।
এই ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে ভুল্লীবাসীর একমাত্র ভরসার জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছেন ঠাকুরগাঁওয়ের কৃতি সন্তান এবং জাতীয় রাজনীতির অভিভাবক মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এলাকার মানুষের বিশ্বাস, ফখরুল সাহেব যদি এই বিষয়টি নিয়ে সোচ্চার হন এবং ব্যক্তিগত ও প্রশাসনিকভাবে এই দাবির পক্ষে শক্ত অবস্থান নেন, তবে ভুল্লী উপজেলা হওয়া এখন কেবল সময়ের ব্যাপার। সাধারণ মানুষের মনে এক তীব্র শঙ্কা কাজ করছে— বর্তমান রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রেক্ষাপটে যদি এই সরকারের আমলে ভুল্লী উপজেলা ঘোষিত না হয়, তবে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার বেড়াজালে এই স্বপ্ন হয়তো আগামী শত বছরেও আর আলো দেখবে না। এটিই আমাদের শেষ সুযোগ, এটিই আমাদের অধিকার আদায়ের চূড়ান্ত সময়।
শ্রদ্ধেয় ফখরুল সাহেব, আপনি এই জনপদের অভিভাবক। এলাকার মানুষ মনে করে, আপনার একটি ইশারা, আপনার একটি বলিষ্ঠ উচ্চারণই পারে এই শত বছরের বঞ্চনার অবসান ঘটাতে। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আপনি যদি এই দাবিটি জাতীয় পর্যায়ে এবং প্রশাসনিকভাবে সুরাহা করার উদ্যোগ না নেন, তবে ভুল্লীর এই ১ লক্ষ ২৯ হাজার মানুষ হয়তো চিরকাল সদর উপজেলার ছায়ায় অবহেলিত হয়েই থাকবে।
এখনই সময় এই দাবি আদায়ের। আর দেরি করলে হয়তো সময়ের চাকা উল্টো দিকে ঘুরে যাবে। আমি জসীমউদ্দীন ইতি, এই জনপদের একজন নগণ্য সংবাদকর্মী হিসেবে এবং ভুল্লীবাসীর একজন প্রতিনিধি হিসেবে আপনার প্রতি বিনীত ও আকুল আবেদন জানাচ্ছি— ভুল্লীকে উপজেলার মর্যাদা এনে দিয়ে আমাদের এই প্রজন্মকে কৃতজ্ঞতার পাশে আবদ্ধ করুন।
আমরা স্বপ্ন দেখি একটি সমৃদ্ধ ভুল্লী উপজেলার, যেখানে নাগরিক সেবা থাকবে হাতের মুঠোয়। আর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে আপনার সক্রিয় উদ্যোগই আমাদের একমাত্র প্রার্থনা।
প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ এখন সরকারের অন্যতম নীতি। জনসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে ভুল্লীকে উপজেলার মর্যাদা দেওয়া সময়ের অনিবার্য দাবি। ১ লক্ষ ২৯ হাজার মানুষের এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে একটি থানার অধীনে রেখে যথাযথ প্রশাসনিক সেবা ও আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করা ক্রমেই অসম্ভব হয়ে পড়ছে। ২৭০টি মসজিদ, ৬৯টি মন্দির ও ৮টি গির্জার এই সম্প্রীতির জনপদকে আরও নিরাপদ ও উন্নত করতে হলে একটি স্বতন্ত্র উপজেলা পরিষদের কোনো বিকল্প নেই।
আমরা জানি, ঠাকুরগাঁওয়ের উন্নয়ন এবং রাজনীতির ধারক-বাহক মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাহেব। তিনি এই জনপদের অভিভাবক। এলাকার লক্ষাধিক মানুষ তার দিকে চেয়ে আছে। হরিপুর, বালীয়াডাঙ্গী, রানীশংকৈল, পীরগঞ্জ ও ভুল্লীর মানুষ বিশ্বাস করে, ফখরুল সাহেব যদি এই বিষয়টি নিয়ে দৃঢ় অবস্থান নেন এবং যথাযথ প্রশাসনিক চ্যানেলে চাপ প্রয়োগ করেন, তবে এই অসাধ্য সাধন করা সম্ভব।
সময়ের কাছে আমাদের দায়বদ্ধতা
ভুল্লী উপজেলা গঠন কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি একটি অবহেলিত জনপদের উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি। আমরা আশা করি, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাহেব ভুল্লীবাসীর এই আকুল আবেদনকে হৃদয়ে ধারণ করবেন এবং এই যৌক্তিক দাবি আদায়ে ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হবেন। শত বছরের এই লালিত স্বপ্ন আর যেন দীর্ঘশ্বাসে পরিণত না হয়। আগামী প্রজন্মের কাছে একটি সমৃদ্ধ, উন্নত ও স্বাধীন ‘ভুল্লী উপজেলা’ উপহার দেওয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। আমরা বিশ্বাস করি, সত্য ও ন্যায়ের জয় হবেই— ভুল্লী হবে একটি গর্বিত উপজেলা। ইনশাআল্লাহ। ইনশাআল্লাহ।