মেধার চরম অবমাননা—শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে ১৮ বছরের অভিজ্ঞ বনাম ‘টিপসই’ যোগ্যতার বিসদৃশ সমীকরণ

জসীমউদ্দীন ইতি।

 

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার এক চরম বৈপরীত্য বা ‘চমক’ যেন আমাদের দৈনন্দিন রুটিনে পরিণত হয়েছে। রাষ্ট্র যখন বিশ্বমানের শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ার স্বপ্ন দেখছে এবং ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ বিনির্মাণের লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে, ঠিক তখনই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নীতিনির্ধারণী কাঠামোর একটি বড় গলদ আমাদের অগ্রযাত্রাকে বারবার প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

একজন শিক্ষককে প্রতিষ্ঠান প্রধান হওয়ার জন্য কঠোর পরিশ্রম, একাডেমিক দক্ষতা এবং দীর্ঘ ১৮ বছরের অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হয়। অথচ, সেই অভিজ্ঞ ও উচ্চশিক্ষিত শিক্ষকের নির্দেশিত প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের (SMC) সভাপতি হওয়ার জন্য ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতার মানদণ্ড যে পর্যায়ে রয়েছে, তা সত্যিই এক গভীর ট্র্যাজেডি।

একজন প্রধান শিক্ষক হওয়ার যাত্রাটি কত দীর্ঘ ও কণ্টকাকীর্ণ—তা একজন শিক্ষকই জানেন। বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার) কিংবা সরাসরি নিয়োগের ধাপগুলো পেরিয়ে, বছরের পর বছর শ্রেণিকক্ষে পাঠদান, প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন এবং অভিজ্ঞতার পাহাড় ডিঙিয়ে যখন তিনি একটি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার হন, তখন তার লক্ষ্য থাকে শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা। কিন্তু এই পুরো প্রক্রিয়ার মাথায় যখন এমন একজন ব্যক্তি বসেন, যিনি হয়তো আধুনিক শিক্ষা নীতিমালা সম্পর্কে বিন্দুমাত্র ধারণা রাখেন না, অথবা যার যোগ্যতা কেবল স্থানীয় রাজনীতি বা প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে ‘সভাপতি’ হিসেবে নির্বাচিত হওয়া, তখন সেখানে পেশাদারিত্বের মৃত্যু ঘটে।

দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এমন অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে যেখানে সভাপতি পদে বসার জন্য স্নাতক বা স্নাতকোত্তর তো দূরের কথা, প্রাথমিক সাক্ষরতা বা ‘টিপসই’ দেওয়ার মতো সাধারণ যোগ্যতাই যেন মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বিসদৃশ সমীকরণটি কি শিক্ষার জন্য অভিশাপ নয়?

আমাদের স্কুল ম্যানেজিং কমিটিগুলো (SMC) অনেক ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক প্রভাবের বলয়ে বন্দি। নির্বাচনের নামে যা হয়, তা মূলত স্থানীয় রাজনীতির আধিপত্য বিস্তার। যোগ্য ও শিক্ষিত অভিভাবকরা অনেক সময় সেই জটিলতায় জড়াতে চান না বলে অযোগ্য ও প্রভাবশালীরাই ক্ষমতার চেয়ার দখল করেন। এর ফলে যা ঘটছে:

১. প্রশাসনিক পঙ্গুত্ব: একজন অভিজ্ঞ প্রধান শিক্ষক যখন তার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে যান, তখন অশিক্ষিত বা স্বল্পশিক্ষিত সভাপতির কাছে তাকে জবাবদিহি করতে হয়। অনেক সময় সভাপতির অযৌক্তিক বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে গিয়ে প্রধান শিক্ষক তার পেশাগত নৈতিকতা বিসর্জন দিতে বাধ্য হন।
২. শিক্ষার পরিবেশ বিঘ্নিত: সভাপতি যখন প্রতিষ্ঠানের ক্রয়-বিক্রয়, নিয়োগ বা অবকাঠামোগত সিদ্ধান্তের ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ চান, তখন শিক্ষার মূল পরিবেশ হারিয়ে যায়। মেধা ও যোগ্যতার চেয়ে এখানে ‘রাজনৈতিক আনুগত্য’ বড় হয়ে ওঠে।
৩. শিক্ষকদের আত্মমর্যাদা: একজন অভিজ্ঞ শিক্ষাবিদ যখন এমন কারো কাছে ‘অসহায়’ হয়ে পড়েন যিনি হয়তো স্কুলের পাঠ্যবইয়ের নামও জানেন না, তখন শিক্ষকের আত্মমর্যাদার ওপর আঘাত লাগে। এতে নতুন প্রজন্মের মেধাবীরা শিক্ষকতা পেশায় আসতে নিরুৎসাহিত হয়।

স্মার্ট বাংলাদেশের পথে এই মডেল কি মানানসই?
আমরা কি পারি একজন অদক্ষ বা অশিক্ষিত ব্যক্তিকে দিয়ে একটি আধুনিক ‘স্মার্ট ক্লাসরুম’ পরিচালনা করতে? ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নে আমাদের প্রয়োজন দূরদর্শী নেতৃত্ব। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যদি অভিভাবক প্রতিনিধির শিক্ষাগত যোগ্যতা বাধ্যতামূলক না হয়, তবে কারিকুলাম বা প্রযুক্তির উন্নয়ন কেবলই বাহ্যিক চাকচিক্য হয়ে থাকবে।

উত্তরণের পথ: সংস্কারের দাবি
সময় এসেছে এই ‘টিপসই’ সংস্কৃতির বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসার। আমরা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে জোর দাবি জানাই:

শিক্ষাগত যোগ্যতা বাধ্যতামূলক করা: SMC বা পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি এবং সদস্যদের জন্য ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা (কমপক্ষে স্নাতক বা সমমান) আইনত বাধ্যতামূলক করতে হবে।

মেধাতান্ত্রিক পরিচালনা: ম্যানেজিং কমিটিতে কেবল প্রভাবশালী নয়, বরং সমাজসেবক, শিক্ষাবিদ এবং উচ্চশিক্ষিত অভিভাবকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য নির্বাচনের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে হবে।

রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তি: শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে রাজনীতির খেলার মাঠ থেকে বের করে এনে পেশাদারিত্বের সুরক্ষা দিতে হবে।

শিক্ষার মেরুদণ্ড যখন অশিক্ষিত বা স্বল্পশিক্ষিতদের নিয়ন্ত্রণের চাপে থাকে, তখন মেরুদণ্ড সোজা হওয়া কঠিন। জাতির ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের এই কারখানাগুলোতে যোগ্য মানুষের হাতেই নেতৃত্ব থাকা উচিত। ‘টিপসই’ সংস্কৃতি বিদায় না নিলে, শত চেষ্টা করেও শিক্ষার গুণগত মানে আমূল পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়।

কর্তৃপক্ষের কাছে বিনীত নিবেদন—১৮ বছরের অভিজ্ঞতা যেন কেবল দীর্ঘ চাকরিকালই না হয়, তা যেন প্রকৃত সম্মানেরও দাবি রাখে।

এ রকম আরো সংবাদ

আমাদের সাথে থাকুন

0FansLike
0SubscribersSubscribe

সর্বশেষ সংবাদ