জসীমউদ্দীন ইতি ঠাকুরগাঁও।
ঠাকুরগাঁও পৌর শহরের নিশ্চিন্তপুর এলাকার এক সাধারণ অথচ অদম্য নারী আসমা বেগম। তার জীবনকাহিনি কোনো রূপকথা নয়, বরং এক কঠোর বাস্তব সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। আমরা যখন প্রতিনিয়ত অভাব আর অভিযোগের কথা শুনি, তখন আসমা বেগম আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে নিজের শ্রম আর ঘাম দিয়ে ভাগ্য বদলাতে হয়। গরু, মুরগি আর কবুতর লালন-পালন করে তিনি শুধু নিজের সংসারই চালাতেন না, বরং মরণব্যাধি ক্যানসারে আক্রান্ত মায়ের চিকিৎসার ব্যয়ভারও বহন করতেন নিজের কাঁধে। কিন্তু নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাসে ল্যাম্পি স্কিন রোগে আক্রান্ত হয়ে তার আয়ের প্রধান উৎস তিনটি গরু যখন মারা গেল, তখন আসমার সেই সাজানো স্বপ্নগুলো মুহূর্তেই ধূলিসাৎ হয়ে যায়। থেমে যায় অসুস্থ মায়ের চিকিৎসা, চারদিকে নেমে আসে অন্ধকার।
ঠিক এই চরম সংকটের মুহূর্তে আসমা বেগম যা করেছেন, তা এক অসীম সাহসিকতার পরিচয়। তিনি দমে যাননি, বরং নিজের মনোবল পুঁজি করে সরাসরি হাজির হয়েছিলেন ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসকের দ্বারে। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে একজন সাধারণ মানুষের পক্ষে জেলা প্রশাসনের সর্বোচ্চ কর্মকর্তার কক্ষে প্রবেশ করা এবং নিজের দুঃখের কথা বলাটা এখনো অনেকটা পাহাড় ডিঙানোর মতোই কঠিন। কিন্তু আসমা বেগম সেই দ্বিধা ও সংকোচ জয় করে জেলা প্রশাসকের কাছে তার সমস্যার কথা খুলে বলেন। আর এখানেই আমরা দেখতে পাই এক জনবান্ধব প্রশাসনের প্রকৃত রূপ। জেলা প্রশাসক ইশরাত ফারজানা তাকে ফিরিয়ে দেননি, বরং মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন একজন অসহায় নারীর আর্তনাদ এবং দিয়েছেন পাশে থাকার দৃঢ় আশ্বাস।
প্রতিশ্রুতি যে কেবল কাগুজে শব্দ নয়, তা প্রমাণ করতেই গত বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) বিকেলে এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হয় নিশ্চিন্তপুরে। প্রথাগত লালফিতার দৌরাত্ম্য বা দাপ্তরিক আনুষ্ঠানিকতা ভেঙে সরাসরি আসমার সেই ভাঙা গোয়ালঘরে সশরীরে উপস্থিত হন জেলা প্রশাসক ইশরাত ফারজানা। সঙ্গে ছিলেন সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খাইরুল ইসলাম এবং সমাজসেবা দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। একজন জেলা প্রশাসক যখন নিজে কাদা-মাটি মাড়িয়ে একজন প্রান্তিক নারীর জরাজীর্ণ আঙিনায় দাঁড়ান, তখন তা কেবল একটি পরিদর্শন থাকে না; তা হয়ে ওঠে প্রশাসনের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থার এক মজবুত ভিত্তি।
ঘটনাস্থলেই সমাজসেবা অধিদপ্তরের বিশেষ তহবিল থেকে আসমার হাতে গরু কেনার জন্য ৫০ হাজার টাকার চেক তুলে দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, তার অসুস্থ মায়ের চিকিৎসা এবং ঘর মেরামতের জন্যও প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন জেলা প্রশাসক। চেক হাতে পেয়ে আসমার সেই আনন্দাশ্রু কেবল কৃতজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ ছিল না, তা ছিল নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর এক নতুন শপথ। আসমা বেগম এখন আবার স্বপ্ন দেখছেন, তার শূন্য গোয়ালঘর আবার গরুর ডাকে মুখরিত হবে, তার মা আবার সঠিক চিকিৎসা পাবেন।
আসমার এই ঘটনাটি আমাদের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় এক ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। রাষ্ট্রের কর্মচারী হিসেবে প্রশাসনের কর্মকর্তারা যদি এভাবে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দিতে পারেন, তবেই একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের স্বপ্ন সার্থক হয়। আসমার অদম্য স্পৃহা যেমন সমাজের অন্য নারীদের জন্য অনুপ্রেরণা, তেমনি জেলা প্রশাসনের এই দ্রুত ও মানবিক পদক্ষেপটিও অন্যান্য কর্মকর্তাদের জন্য এক অনুকরণীয় মডেল হতে পারে।
আমরা আশা করি, আসমা বেগমের এই ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পটি যেন কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হয়ে না থাকে। দেশের প্রতিটি প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য আসমা বেগম যেন প্রশাসনের এমন সহানুভূতি ও সহযোগিতা পান। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সাথে প্রশাসনের এই নিবিড় বন্ধনই পারে একটি সমৃদ্ধ ও মানবিক বাংলাদেশ গড়তে। আসমা বেগমের জয় হোক, জয় হোক মানবিকতার।