জসীমউদ্দীন ইতি, ঠাকুরগাঁও
গত শুক্রবার (৬ মার্চ) বিকেলে ঠাকুরগাঁওয়ের আকাশ-বাতাস যেন এক অপার্থিব আনন্দে মুখরিত হয়ে উঠেছিল। কোনো রাজনৈতিক শোডাউন নয়, কোনো সেলিব্রিটির আগমন নয়; বরং পবিত্র কুরআনের দুই কিশোর হাফেজকে বরণ করে নিতে রাস্তার দুই ধারে ঢল নেমেছিল হাজারো মানুষের। ঠাকুরগাঁও শহর থেকে বালিয়াডাঙ্গী পর্যন্ত দীর্ঘ ২২ কিলোমিটার পথ জুড়ে যে সংবর্ধনা র্যালি অনুষ্ঠিত হয়েছে, তা জেলাবাসীর হৃদয়ে এক চিরস্থায়ী স্মৃতি হয়ে থাকবে।
সৈয়দপুরে অনুষ্ঠিত ‘Sharjah Charity International’ আয়োজিত আন্তর্জাতিক কুরআন প্রতিযোগিতায় ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার জমিরিয়া ইহ্ইয়াউল উলুম মাদ্রাসার দুই কৃতি শিক্ষার্থীর এই সাফল্য কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জয় নয়, এটি পুরো উত্তরবঙ্গের ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার এক বলিষ্ঠ বিজয়বার্তা।
সাফল্যের খতিয়ান ও অর্জনের গৌরব !
১০ পারা গ্রুপে প্রথম স্থান অধিকার করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন সাব্বির আহমাদ। চাড়োল ইউনিয়নের সাবাজপুর গ্রামের এক সাধারণ পরিবারের সন্তান সাব্বির আজ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ঠাকুরগাঁওয়ের প্রতিনিধি। তার এই অর্জনের পুরস্কার হিসেবে পবিত্র উমরাহ হজ পালনের সুযোগ এবং নগদ অর্থ প্রাপ্তি কেবল তার ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং এটি প্রতিটি কুরআন প্রেমী মানুষের জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণা। অন্যদিকে, ৩০ পারা গ্রুপে তৃতীয় স্থান অর্জনকারী জুনায়েদ হাসান প্রমাণ করেছেন যে, কঠিন অধ্যবসায় ও একনিষ্ঠতা থাকলে যেকোনো বড় মঞ্চে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করা সম্ভব। রাণীশংকৈলের এই তরুণ মেধাবী ছাত্রের এই সাফল্য আমাদের জেলার জন্য পরম পাওয়া।
বিজয়ীদের বরণ করে নেওয়ার দৃশ্যটি ছিল বর্ণাতীত। একটি ছাদখোলা সুসজ্জিত গাড়িতে দুই খুদে হাফেজকে বসিয়ে যখন ঠাকুরগাঁও থেকে বালিয়াডাঙ্গীর পথে রওনা দেওয়া হয়, তখন কয়েকশ মোটরসাইকেলের বহর ও সাধারণ মানুষের মুহুর্মুহু হর্ষধ্বনি পরিবেশকে এক অন্যরকম আধ্যাত্মিক আবহে ভরিয়ে দেয়। রাস্তার মোড়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা সাধারণ মানুষের চোখে ছিল আনন্দের জল আর মুখে ছিল দোয়ার গুঞ্জন। এই ২২ কিলোমিটারের র্যালি কেবল একটি সংবর্ধনা ছিল না, এটি ছিল মেধার প্রতি গণমানুষের ভালোবাসার এক জীবন্ত বহিঃপ্রকাশ।
এই দীর্ঘ ও কঠিন পথচলার নেপথ্য কারিগর হিসেবে কাজ করেছেন মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক মুফতি শরিফুল ইসলাম ও তাঁর সুযোগ্য শিক্ষকবৃন্দ। মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের একাগ্রতা এবং অভিভাবকদের নিঃস্বার্থ সহযোগিতার ফলেই আজ সাব্বির ও জুনায়েদরা ঢাকার উত্তরা এলাকার গ্র্যান্ড ভিস্তানা হোটেলের মতো অভিজাত মঞ্চে দাঁড়িয়ে পুরস্কার গ্রহণ করতে পেরেছে। মুফতি শরিফুল ইসলামের বক্তব্যে ফুটে উঠেছে একরাশ তৃপ্তি— তিনি মনে করেন, এই সাফল্য আগামী দিনে মাদ্রাসার অন্য শিক্ষার্থীদের মাঝে এক বিশাল প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব তৈরি করবে।
সাব্বির ও জুনায়েদদের এই জয় আমাদের সমাজের জন্য একটি বড় বার্তা বহন করে। আমাদের প্রান্তিক জনপদের মাদ্রাসাগুলোতে যে কী পরিমাণ মেধা সুপ্ত অবস্থায় আছে, তা এই আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতাগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কি এই মেধাবীদের সঠিক মূল্যায়ন করছি? কেবল একদিনের র্যালি বা পুষ্পস্তবকেই যেন আমাদের দায়িত্ব শেষ না হয়। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে এই কৃতি সন্তানদের উচ্চতর শিক্ষা ও গবেষণার পথ সুগম করে দেওয়া এখন সময়ের দাবি।
ঠাকুরগাঁও আজ গর্বিত। এই জেলার প্রতিটি ধূলিকণা যেন আজ সাব্বির আর জুনায়েদের সাফল্যের গানে মুখর। তাদের এই পথচলা অব্যাহত থাকুক এবং কুরআনের এই নূর প্রতিটি ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ুক— এই প্রত্যাশাই রইল।