শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতির ‘মহোৎসব’, বিপন্ন ঠাকুরগাঁওয়ের শিক্ষা ব্যবস্থা, জাতির মেরুদণ্ড কি আজ রুগ্ন?

জসীমউদ্দীন ইতি, ঠাকুরগাঁও

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান একটি জাতির মেরুদণ্ড এবং জ্ঞান অর্জনের পবিত্র ভূমি। কিন্তু সেই পবিত্র ভূমিতে যখন দুর্নীতির বিষবৃক্ষ দানা বাঁধে, তখন তা গোটা জাতির ভবিষ্যতের জন্য এক চরম অশনিসংকেত হয়ে দাঁড়ায়।

সম্প্রতি পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (DIA) থেকে প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে শিক্ষা খাতের যে চিত্র উঠে এসেছে, তা কেবল হতাশাজনক নয়, বরং দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার গভীরে ছড়িয়ে থাকা দুর্নীতির এক বীভৎস রূপ। এই অনিয়মের ঢেউ সরাসরি আছড়ে পড়েছে ঠাকুরগাঁও জেলাতেও।

পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত ১ জুলাই ২০২৫ থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত সময়ে সারাদেশে মোট ১৯৭টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অডিট কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। এই অডিট রিপোর্টে যে ভয়াবহ অনিয়মের তালিকা উঠে এসেছে, তা যে কাউকে বিস্মিত করবে। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, জাল বা ভুয়া সনদ ব্যবহার করে শিক্ষকতা, ভুয়া নিয়োগের মাধ্যমে এমপিও সুবিধা গ্রহণ, সরাসরি অর্থ আত্মসাৎ এবং ভ্যাট ও আইটি সংক্রান্ত ব্যাপক আর্থিক অনিয়ম হয়েছে।

সবচেয়ে আঁতকে ওঠার মতো তথ্য হলো এই অনিয়মের আর্থিক ও সম্পদগত পরিমাণ। প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়েছে যে, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে প্রায় ৮১ কোটি ৮২ লক্ষ ২৫ হাজার ৬০৭ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত আনতে হবে।

শুধু তাই নয়, প্রায় ১৭৬.৫২৩ একর জমি উদ্ধারের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে, যা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ব্যবস্থাপনায় চরম বিশৃঙ্খলা ও দুর্নীতির প্রমাণ দেয়।

সারাদেশের এই দুর্নীতির মানচিত্রে নাম উঠেছে আমাদের জেলা ঠাকুরগাঁওয়েরও। DIA-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জেলার ৫টি স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো:
১. বড় পলাশবাড়ী ইসলামি আলিম মাদ্রাসা (বালিয়াডাঙ্গী)
২. সালন্দর ডিগ্রি কলেজ (ঠাকুরগাঁও সদর)
৩. কাঁঠালডাঙ্গী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় (হরিপুর)
৪. রনহট্ট চৌরঙ্গী উচ্চ বিদ্যালয় (হরিপুর)
৫. হরিপুর মহিলা কলেজ (হরিপুর)

এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়া মানেই যে প্রতিষ্ঠানগুলো পুরোপুরি অপরাধী—এমনটি ভাবা হয়তো ঠিক হবে না, তবে সরকারি দপ্তরের অনুসন্ধানে যখন সুনির্দিষ্ট নাম উঠে আসে, তখন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনা পর্ষদ ও শিক্ষকদের নৈতিক দায়বদ্ধতা নিয়ে বড় প্রশ্ন দেখা দেয়। সাধারণ অভিভাবকরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন, প্রতিষ্ঠানের ভেতরে দিনের পর দিন এই আর্থিক লেনদেনের অস্বচ্ছতা কীভাবে চলল?

এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে হরিপুর উপজেলার ‘রণহট্টা চৌরঙ্গী উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক অনিল চন্দ্র** বলেন, আমি এখনো পর্যন্ত অভিযুক্ত শিক্ষকদের নাম জানি না। তবে আমি তা জানার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। প্রধান শিক্ষকের এমন বক্তব্যে জনমনে বিভ্রান্তি আরও বেড়েছে।

ঠাকুরগাঁও জেলা শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক **ফারুক হোসেন** বলেন, “আমরা মনে করি কেবল টাকা উদ্ধারই সমাধান নয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবস্থাপনায় আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। জেলা শিক্ষা অফিস এবং সংশ্লিষ্ট বোর্ডগুলোকে এখন আরও বেশি সক্রিয় হতে হবে যেন প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়।

‘সচেতন মহলের উদ্বেগ ও প্রশাসনের আশ্বাস,

ঠাকুরগাঁওয়ের সচেতন নাগরিকরা দাবি তুলেছেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আমরা কী শিক্ষা দিচ্ছি? যদি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিরাই অনিয়মের সাথে জড়িয়ে পড়েন, তবে ছাত্র-ছাত্রীদের নৈতিকতা কার কাছে আশা করব? তারা অনতিবিলম্বে অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে ঠাকুরগাঁও জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা শাহীন আক্তার বলেন, “আপাতত আমরা শুধু অভিযুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম দেখতে পাচ্ছি। এখন পর্যন্ত ওইসব প্রতিষ্ঠানের নির্দিষ্ট জাল সনদধারী শিক্ষকদের চিহ্নিত করা যায়নি। তবে আমরা খুব শীঘ্রই তদন্ত শুরু করব এবং দ্রুতই অভিযুক্তদের নাম প্রকাশ করতে পারব।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর কেবল অডিট রিপোর্ট প্রকাশ করে বা টাকা ফেরতের সুপারিশ করেই দায়িত্ব শেষ করতে পারে না। জাল সনদ ও ভুয়া নিয়োগের মাধ্যমে যারা শিক্ষা ব্যবস্থায় অনুপ্রবেশ করেছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি। নতুবা দুর্নীতির এই কালো থাবা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে চিরতরে পঙ্গু করে দেবে।

প্রতিবেদক:জসীমউদ্দীন ইতি ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি, দৈনিক শিক্ষা ডটকম

মোবাইল: ০১৭৫১০৭৯৮২৩

এ রকম আরো সংবাদ

আমাদের সাথে থাকুন

0FansLike
0SubscribersSubscribe

সর্বশেষ সংবাদ