ঠাকুরগাঁওয়ের নতুন দিগন্ত—ত্রাণ নয়, প্রয়োজন টেকসই উন্নয়ন

জসীমউদ্দীন ইতি ঠাকুরগাঁও।

 

উত্তরের জেলা ঠাকুরগাঁওয়ের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে দারিদ্র্য বিমোচন একটি দীর্ঘস্থায়ী চ্যালেঞ্জ। আমাদের দেশে ত্রাণ বিতরণের সংস্কৃতি দীর্ঘদিনের। তবে মাঝেমধ্যেই কিছু উদ্যোগ আমাদের প্রথাগত সেই চিন্তাধারাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। সম্প্রতি ঠাকুরগাঁও সদরে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নেতা দেলাওয়ার হোসেনের উদ্যোগে ৩৬টি ছাগল ও ৭টি টিউবওয়েল বিতরণ করা হলো। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি সাধারণ মানবিক সহায়তা কার্যক্রম মনে হলেও, এর ভেতরে লুকিয়ে আছে একটি টেকসই উন্নয়নের বার্তা।

আমরা যখন কোনো দুস্থ পরিবারকে নগদ অর্থ সহায়তা দেই, তা মূলত তাৎক্ষণিক ভোগের চাহিদা মেটায়। কিন্তু যখন কোনো পরিবারকে গবাদিপশু বা উৎপাদনশীল সম্পদ দেওয়া হয়, তা সেই পরিবারের জন্য একটি আয়ের উৎস তৈরি করে। ৩৬টি ছাগল ৩৬টি পরিবারের জন্য কেবল পশু নয়, বরং আগামী কয়েক বছরের জন্য স্বনির্ভর হওয়ার এক একটি ‘পুঁজি’। এই ছাগলগুলো যখন বংশবৃদ্ধি করবে, তখন সেটি দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র ভাঙতে সহায়ক হবে। আমরা মনে করি, ত্রাণ বিতরণের চেয়ে এই ‘সম্পদ হস্তান্তর’ মডেলটি অনেক বেশি কার্যকর এবং প্রশংসনীয়।

৭টি টিউবওয়েল স্থাপনের বিষয়টি কোনোভাবেই ছোট করে দেখার উপায় নেই। গ্রামীণ জনপদে বিশুদ্ধ পানির অভাব পানিবাহিত রোগের অন্যতম কারণ। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের জন্য নিরাপদ পানির উৎস না থাকায় যে স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি হয়, তা বিশাল। টিউবওয়েল স্থাপনের মাধ্যমে কেবল পানি নয়, বরং একটি এলাকার জনস্বাস্থ্যের ভিত্তি মজবুত করা হয়েছে। এটি মৌলিক নাগরিক অধিকারের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত।

বর্তমান সময়ে দেশের রাজনীতির যে চিত্র আমরা দেখি—তাতে বিদ্বেষ, পাল্টাপাল্টি দোষারোপ এবং সংকীর্ণতার আধিক্য প্রবল। এমতাবস্থায় দেলাওয়ার হোসেনের বক্তব্য, ‘আমরা কখনো হিংসার রাজনীতি করতে চাই না, জনগণের পাশে থাকাই আমাদের লক্ষ্য’—এটি বর্তমান সময়ের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক বার্তা। রাজনীতির মূল লক্ষ্য যদি হয় সেবা ও সহমর্মিতা, তবেই সমাজ স্থিতিশীল থাকে। সকল মত ও পথের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ানোর এই সংস্কৃতিই প্রকৃত রাজনীতির সৌন্দর্য। এটি ঠাকুরগাঁওয়ের সামাজিক সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধকে আরও সুদৃঢ় করবে।

তবে একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন—সহায়তা দেওয়াটাই কাজের শেষ নয়। যারা এই গবাদিপশু ও নলকূপ পেলেন, তাদের দায়িত্ব হচ্ছে সম্পদগুলোর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ করা। অতীতে দেখা গেছে, তদারকির অভাবে অনেক ভালো উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছে। আমরা আশা করবো, সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তা ও স্থানীয় নেতাকর্মীবৃন্দ নিয়মিত ফলো-আপ বা তদারকি করবেন যাতে এই টিউবওয়েলগুলো দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং ছাগলগুলো সঠিক পুষ্টি ও যত্নে লালিত হয়।
ঠাকুরগাঁওয়ের এই উদ্যোগটি কি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হয়ে থাকবে, নাকি এটি একটি সামাজিক আন্দোলনের সূচনা?

আমরা চাই এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় পরিণত হোক। যদি রাজনৈতিক দলগুলো পাল্টাপাল্টি কর্মসূচির পরিবর্তে এ ধরণের গঠনমূলক ও মানবিক কর্মসূচি হাতে নেয়, তবেই সাধারণ মানুষের দুঃখ কিছুটা হলেও লাঘব হবে। রাজনীতি হোক মানুষের সেবা করার হাতিয়ার—ঠাকুরগাঁওয়ের এই ঘটনা সেই প্রত্যাশারই প্রতিফলন।

এ রকম আরো সংবাদ

আমাদের সাথে থাকুন

0FansLike
0SubscribersSubscribe

সর্বশেষ সংবাদ