কন্যাসন্তান আশীর্বাদ, বোঝা নয়: বাবার দায়িত্ব ও আগামীর স্বপ্ন

জসীমউদ্দীন ইতি ঠাকুরগাঁও।

 

আমাদের সমাজ আধুনিক হয়েছে, প্রযুক্তির ছোঁয়া লেগেছে প্রতিটি ঘরে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, আজও কিছু মানুষের সংকীর্ণ মানসিকতা বদলায়নি। আজও শোনা যায়, কন্যাসন্তান জন্ম নিলে অনেক পিতার মুখ কালো হয়ে যায়, পরিবারে নেমে আসে নিরব বিষাদ। অথচ পবিত্র ধর্মগ্রন্থ থেকে শুরু করে আধুনিক বিজ্ঞান—সবখানেই কন্যাসন্তানকে রহমত ও আশীর্বাদ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।

সম্প্রতি ঠাকুরগাঁওয়ের রানীশংকৈলের সাংবাদিক মাহাবুব আলমের ঘর আলো করে আসা জমজ দুই কন্যাসন্তানের খবর আমাদের সমাজকে এক ইতিবাচক বার্তা দেয়। তাঁর সেই তৃপ্তির হাসি আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শুকরিয়া আদায় করা স্ট্যাটাসটি প্রমাণ করে, সন্তান ছেলে হোক বা মেয়ে—সেটি বড় কথা নয়, সুস্থ সন্তানই আল্লাহর শ্রেষ্ঠ উপহার। কিন্তু মাহাবুব আলমের এই আনন্দের বিপরীতে আমাদের সমাজে এমন অনেক পিতাও আছেন, যারা কন্যাসন্তানের খবর শুনে স্ত্রীকে দোষারোপ করেন কিংবা সন্তানের প্রতি উদাসীন হয়ে পড়েন।

ইতিহাস সাক্ষী, আজকের পৃথিবীতে নারীরা কোনো অংশেই পিছিয়ে নেই। হিমালয় জয় থেকে শুরু করে মহাকাশ গবেষণা, কিংবা দেশের নীতি নির্ধারণী পর্যায়—সবখানেই কন্যারা তাদের মেধার স্বাক্ষর রাখছে। একজন পিতা যদি তার কন্যাসন্তানকে অবহেলা না করে সঠিক শিক্ষা ও ভালোবাসা দিয়ে গড়ে তোলেন, তবে সেই কন্যাই হতে পারে বৃদ্ধ বয়সে বাবার সবচেয়ে বড় লাঠি। কন্যাসন্তানরা সাধারণত ছেলেদের তুলনায় মা-বাবার প্রতি বেশি সংবেদনশীল এবং যত্নশীল হয়।

সন্তানের খোঁজখবর নেওয়া এবং তাদের আগলে রাখা কেবল মায়ের কাজ নয়, এটি প্রত্যেক পিতার নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব। অনেক পিতা মনে করেন, কন্যাসন্তান মানেই পরের বাড়ি চলে যাবে, তাই তাদের পেছনে বিনিয়োগ বা সময় দেওয়া বৃথা। এই ভুল ধারণাটিই সমাজকে পিছিয়ে দিচ্ছে। মনে রাখবেন, যে পিতা তার কন্যাসন্তানের আগমনে মন খারাপ করেন বা তাদের লালন-পালনে অবহেলা করেন, তিনি আসলে নিজের শেকড়কেই দুর্বল করছেন। অবহেলিত সন্তানরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে, যা তাদের ভবিষ্যৎ জীবনকে অন্ধকারে ঠেলে দেয়।

সন্তানের লিঙ্গ নির্ধারণে মায়ের কোনো ভূমিকা নেই, এটি সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক ও প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। তাই কন্যাসন্তান হওয়ার কারণে স্ত্রীকে নিগৃহীত করা বা নিজের মন ছোট করা কেবল মূর্খতা নয়, বরং এক ধরনের সামাজিক অপরাধ। সাংবাদিক মাহাবুব আলমের মতো আমাদের প্রত্যেক পিতাকে গর্বের সাথে বলতে হবে, “আমি কন্যাসন্তানের বাবা, আমি ধন্য।

পরিশেষে বলব, সন্তান ছেলে হোক বা মেয়ে, তারা আমাদেরই অংশ। তাদের সঠিক খোঁজখবর নিন, তাদের বন্ধু হোন এবং একজন দায়িত্বশীল অভিভাবক হিসেবে তাদের পাশে দাঁড়ান। কন্যাসন্তানকে বোঝা মনে না করে আগামীর সম্পদ হিসেবে গড়ে তুলুন। মাহাবুব আলম ভাইয়ের দুই রাজকন্যার জন্য রইল অনেক দোয়া ও ভালোবাসা। তারা যেন বাবার আদর্শে বড় হয়ে ঠাকুরগাঁও তথা দেশের মুখ উজ্জ্বল করতে পারে।

আসুন, কুসংস্কারের দেয়াল ভেঙে আমরা কন্যান্তানদের জন্য এক নিরাপদ ও সম্মানজনক পৃথিবী গড়ে তুলি।

এ রকম আরো সংবাদ

আমাদের সাথে থাকুন

0FansLike
0SubscribersSubscribe

সর্বশেষ সংবাদ