
মনিরামপুর সংবাদদাতা।।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যশোর-৫ (মণিরামপুর) আসনে ৬ জন প্রার্থী থাকলেও প্রচার-প্রচারনায় আছেন ৩ জন। প্রথমদিকে ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভবনা খাকলেও ধীরে সে চিত্র পাল্টে গেছে। এ আসনে উল্লেখযোগ্য হারে রয়েছে আওয়ামী লীগ এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোটার। ফলে আওয়ামী লীগ এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোটারদের ওপর অনেকটায় নির্ভর করবে জয়-পরাজয়।
সেক্ষেত্রে উপজেলা বিএনপির সদ্য বহিষ্কৃত সভাপতি স্বতন্ত্র প্রার্থী অ্যাড. শহীদ ইকবালের কলস প্রতীককে তারা ঘাড়ে নিচ্ছেন-এমন চিত্র উঠে এসেছে আওয়ামী লীগ এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোটারদের সাথে আলাপ করে।
উপজেলা নির্বাচন অফিসার কামরুজ্জামান জানান, মণিরামপুর উপজেলা নিয়ে গঠিত যশোর-৫ আসনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এবার ১২৮ কেন্দ্রে মোট ভোটারের সংখ্যা ৩ লাখ ৬৯ হাজার ৮২ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৮৪ হাজার ২১৫ এবং মহিলা ১লাখ ৮২৩ জন। এছাড়া ৪ জন রয়েছে অন্যান্য ভোটার।
এ আসন থেকে ৬ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দীতা করলেও মূলত ৩ জন প্রার্থীর প্রচার প্রচারনা ভোটারদের দৃষ্টি আকৃষ্ট করেছে। এর মধ্যে বিএনপি জোটের শরিক জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের একাংশের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা রশিদ আহমাদ-ধানের শীষ প্রতীক, জামায়াতে ইসলামীর অ্যাড. গাজী এনামুল হক-দাড়িপাল্লা এবং বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী সদ্য বহিষ্কৃত উপজেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাড. শহীদ ইকবাল হোসেন-কলস প্রতীক নিয়ে নির্বাচনের মাঠে জোর প্রচারনায় রয়েছেন। অপর ৩ প্রার্থীর মধ্যে ইসলামী আন্দোলনের জয়নাল আবেদীন টিপু-হাতাপাখা, জাতীয় পার্টির এমএ হালিম-লাঙ্গল এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ব্যারিষ্টার কামরুজ্জামান-ফুটবল প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন। তবে এ ৩ প্রার্থীর মধ্যে হাতপাখা প্রতীকের প্রচার একটু নজরে আসলেও অপর ২ প্রার্থীর প্রচারনা তেমন নেই।
তথ্যানুসন্ধানে জানাযায়, এ আসনে আওয়ামী লীগের ভোট রয়েছে প্রায় ১ লাখ ৪০ থেকে ৫০ হাজার, বিএনপির ১ লাখ ১৫ থেকে ২০ হাজার, জামায়াতে ইসলামীর ৫০ থেকে ৫৫ হাজার। অপরদিকে জমিয়তের ৫ হাজার মত, ইসলামী আন্দোলনের ৫/৬ হাজার, জাপার ৫/৬ থেকে আট হাজার। বাকী ভোটার রয়েছে অন্যান্য দলের। এ আসনের জামায়াতের প্রার্থী অ্যাড. গাজী এনামুল হক মনে করেন প্রতিদ্বনিন্দতা হবে মূলত: স্বতন্ত্র কলস প্রতিকের প্রার্থী শহীদ ইকবাল হোসেনের সাথে। কিন্তু তার প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট আহসান হাবিব লিটন জানান, জামায়াত প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দিতা হবে ধানের শীষের সাথে।
এ দিকে বিএনপি থেকে প্রথমে মনোনয়ন পান উপজেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাড. শহীদ ইকবাল হোসেন। শহীদ ইকবালের প্রচার-প্রচারনা যখন তুঙ্গে তখন ২৪ ডিসেম্বর এ আসনটি ছেড়ে দেওয়া হয় বিএনপি জোটের শরিক জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের একাংশের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা রশিদ আহমাদকে (প্রয়াত সাবেক প্রতিমন্ত্রী মুফতি মুহাম্মদ ওয়াক্কাসের ছেলে)। কিন্তু বিএনপির নেতাকর্মীদের অভিযোগ বিগত ১৫ বছর আওয়ামী লীগের শাসনামলে মনিরামপুরে বিএনপির ১২ নেতাকর্মী কতিথ ক্রস ফায়ারে নিহত এবং কয়েক’শ আহত হয়। দেড় শতাধীক মিথ্যা মামলায় অর্ধলক্ষ নেতাকর্মী আসামি হয়ে বাড়িঘর ছেড়ে পলাতক ছিলেন। অথচ জমিয়তের রশিদ আহমাদের নামে কোন মামলা নেই।ফলে রশিদ আহমাদকে ধানের শীষের প্রার্থী করায় বিএনপিতে বিদ্রোহের দাবানল জ¦লে ওঠে। একপর্যায়ে নেতাকর্মীদের চাপের মুখে শহীদ ইকবাল হোসেন বিদ্রোহী হিসেবে স্বতন্ত্র প্রার্থী (কলস) হন। ইতোমধ্যে বিএনপি থেকে শহীদ ইকবালকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তার পক্ষে কাজ করার দায়ে বিএনপির পৌরসহ ৫টি ইউনিয়নের কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। বহিষ্কার করা হয়েছে আরো অনেক নেতাকে। তার পরও উল্লেখযোগ্য হারে নেতাকর্মী রয়েছেন শহীদ ইকবালের সাথে। তবে ধানের শীষের প্রার্থী রশিদ আহমাদের প্রত্যাশা সৎ এবং বিনয়ী হিসেবে ভোটাররা তাকেই বিজয়ী করবেন। রশিদ আহমাদ জানান, দলীয় প্রতীক হিসেবে বিএনপির নেতাকর্মীরা শেষ বেলায় তার পক্ষেই কাজ করবেন। অন্যদিকে স্বতন্ত্র কলস প্রতীকের প্রার্থী শহীদ ইকবাল হোসেন জানান, দলমত নির্বিশেষে এবং সব ধর্মের লোকদের সমন্বয়ে তিনি নির্বাচন করছেন। তার আশা জনগণ এবার ভোট দিয়ে তাকেই নির্বাচিত করবে। শহীদ ইকবাল হোসেন জানান, এ নির্বাচনে তিনি বিজয়ী হলে এলাকায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখাসহ সার্বিক উন্নয়ন করে সমাজে শান্তির সুবাতাস প্রতিষ্ঠিত করা হবে। তবে তিনি দাড়িপাল্লাকে মূল প্রতিদ্বন্দী হিসেবে দেখছেন।
জানাযায়, মণিরামপুর এ আসনটি মূলত স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত সংসদ নির্বাচনে অধিকাংশ আওয়ামী লীগ ঘরনার প্রার্থীরাই বিজয়ী হন। শুধুমাত্র ১৯৭৯ সালে বিএনপির আফসার আহমেদ সিদ্দিকী (ধানেরশীষ) এবং ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোটের ইসলামী ঐক্যজোটের মুফতি মুহাম্মদ ওয়াক্কাস (ধানেরশীষ) সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এ আসন থেকে ১৯৮৬ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রথম বিজয়ী হয় মুফতি মুহাম্মদ ওয়াক্কাস।
আবার আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী হিসেবে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে স্বপন ভট্টাচার্য ২০১৪ সাল এবং এস এম ইয়াকুব আলী ২০২৪ সালে বিজয়ী হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। যেহেতু এবার ত্রয়োদশ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিচ্ছেন না। আওয়ামী লীগের ১ লাখ ৪০ হাজার ভোটের মধ্যে হিন্দু ও মতুয়া সম্প্রদায়ের ভোট রয়েছে প্রায় ৭০ হাজার। বিশেষ করে ভবদহ এলাকার ৬টি ইউনিয়নের মধ্যে ৯৬ গ্রামে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোট ব্যাংক রয়েছে।
ফলে এবার এ নির্বাচনে বিজী হতে আওয়ামী লীগ এবং সংখ্যালঘু ভোটাররা বড় ফ্যাক্টর হিসেবে দেখা দিয়েছে। সংখ্যালঘুদের সংগঠন মতুয়া নেতা হরিচাঁদ মল্লিক, সুকৃতি বিশ^াস, নীল রতন দাসসহ অনেকেই জানিয়েছেন, সংখ্যালঘুদের যে প্রার্থী নিরাপত্তা দিতে পারবে এবার সে প্রার্থীকেই তারা ভোট দিবে।
উপজেলা পূজা পরিষদের সভাপতি তুলসি বসু, পূজা উদযাপন কল্যাণ ফ্রন্টের সাধারন সম্পাদক সন্তোষ রায়, অধ্যক্ষ তাপস কুন্ডুসহ অনেকেই জানিয়েছেন, সে ক্ষেত্রে সংখ্যালঘুরা এ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষেই সমর্থন দিয়েছেন। বাস্তব চিত্রে এমনটি উঠে এসেছে।