
সিদ্দিকুর রহমান শাহীন, ফুলবাড়ী (কুড়িগ্রাম)
অবাক করার মত, সেনাবাহিনীর তিন কর্মকর্তা একই পরিবারে। একজন ছেলের স্ত্রী মেজর ডা. তাহসীনা তাসনিম বিএমএ তে কর্মরত। আর দুই কর্মকর্তার জন্ম দিয়ে মা আয়েশা খাতুন হয়েছেন বাবা আক্কাস আলী কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার গর্বিত পরিবার হিসাবে ঠাঁই নিয়েছেন।
আয়েশা খাতুন রাবাইতড়ি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আর বাবা আক্কাস আলী স্বাস্থ্য সহকারী। কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার নিভৃত পল্লী রাবাইতাড়ি গ্রামে তাদের বসবাস।
আয়েশা খাতুন অনেকটা একাই দেখভাল করেন সংসারে।
দুই ছেলের মধ্যে বড় ছেলে মেজর আব্দুল্ল্যাহ মেহেদী। তিনি এখন বাংলাদেশ মিরিটারী একাডেমি ভাটিয়ারিতে প্লাটুন কমান্ডার হিসাবে কর্মরত।
সদ্য কমিশন প্রাপ্ত ছোট ছেলে (লেপ্টেনেল্ট) আহসান হাবীব আবীর। তিনি কাপ্তাই সেনা ইউনিটে ২ ডিসেম্বর ২৫ তারিখে যোগদান করেছেন।
সদাহাস্য আয়েশা খাতুনের ভাষায় ”আমি একজন মা, একজন প্রধান শিক্ষক, আর আজ একজন গর্বিত নারী। গ্রামের সাধারণ ঘর থেকে উঠে আমার দুই ছেলে আজ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অফিসার। এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ। আমি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, আমার স্বামীও সরকারি চাকরিজীবী। দু’জনের ব্যাস্ততার মাঝেও সন্তানদের পথচলা ও গড়ে তোলা ছিল সত্যিকারের চ্যালেঞ্জরের দায়িত্ব।”
রত্নগর্ভা মা আয়েশা খাতুন সংসার,বিদ্যালয় আর কাজের চাপেও চালিয়েছেন ছেলেদের বড় করে তোলার কাজটি। ক্যাডেট কলেজ ভর্তি প্রস্তুটির সময়টিই ছিল সবচেয়ে কঠিন সময়। বড় ছেলের কোচিং ছিল টাঙ্গাইলে, ছোট ছেলের কোচিং রংপুরে। বড় ছেলের সময় থেকে টাঙ্গাইল-রংপুর-বাড়ী যাতায়াত, অফিসের দায়িত্ব, স্কুলের মিটিং সব মিলিয়ে সময় বের করা ছিল বিশাল চ্যালেঞ্জের। এরপর ছেলের বিএমএ-এর কঠোর প্রশিক্ষণের চাপ। প্রতিদিনের দুশ্চিন্তা, টেনশন ও অনিশ্চয়তা। তবুও ছেলেদের আত্মবিশ্বাসই শক্তি দিয়েছেন তাকে।
এই অভিজ্ঞতা থেকে আজকের অভিভাবকদের জন্য আয়েশা খাতুনের কথা ‘সন্তানকে সময় দিন, সময় কম হলেও আন্তরিক ভাবে মনোযোগ দিন। ছোটবেলা থেকেই শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ ও সহনশীলতা শেখান। পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা, ব্যক্তিত্ব ও নৈতিকতা সবকিছুই সমান গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানকে উৎসাহ দিন, বিশ্বাস রাখুন, তাদের স্বপ্নকে মূল্য দিন।’
এই গর্বিত মা অভিভাবকদের উদ্দ্যেশে আরও বলেন, ‘সন্তানকে অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহার থেকে দূরে রাখুন। প্রত্যেক শিশু নিজস্ব প্রতিভা নিয়ে জন্মায়। আর সন্তানের সামনে হতাশা বা নেতিবাচকতা কখনো দেখাবেন না, এতে মন দুর্বল হয়ে যায়।’
আয়েশা খাতুন ১৯৯৯ সালে প্রধান শিক্ষক হিসেবে আজকের তাঁর কর্মস্থলে নিয়োগ প্রাপ্ত হন। তাঁর কর্মক্ষেত্র তাঁর কাছে শান্তির জায়গা। নিজের ভেতরে যতটুকু আছে তার পুরোটাই তিনি ঢেলে দিতে পারলে তিনি খুশি হন। তিনি প্রতিটি শির্ক্ষাথীকে নিজের সন্তান হিসাবে মনে করেন। তাঁর বিভিন্ন শির্ক্ষাথী দেশ বিদেশের বিভিন্ন দপ্তরে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করছে-এটা ভাবতেই বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করে।
‘আজ আমার সন্তানরা দেশের সেবা করছে,এটাই আমার সবচেয়ে বড় পরিচয়। এই গর্ব ও আনন্দ আপনাদের সঙ্গে ভাগ করে নিলাম।’
গর্বিত মা আয়েশার মন্তব্য। শেষে তিনি সন্তান ও পারিবারিক বন্ধন যেন সুদৃঢ় থাকে, কর্মজীবনের শেষ দিনেও যেন আলোকবর্তীকা হিসাবে কাজ করতে পারি। 