মোহাম্মদ আবু দারদা, ফেনী।
বিচার বিভাগের দীর্ঘদিনের কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে এবং নির্বাহী বিভাগ থেকে একে সম্পূর্ণ ও কার্যকরভাবে পৃথক করার লক্ষ্যে ঐতিহাসিক ‘সুপ্রীম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করা হয়েছে। রবিবার, ৩০ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন সংবিধানের ৯৩(১) অনুচ্ছেদে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে এই অধ্যাদেশটি প্রণয়ন ও জারি করেন। এর মাধ্যমে বিচার প্রশাসনের তত্ত্বাবধান, নিয়ন্ত্রণ, শৃঙ্খলাবিধান এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনার পূর্ণ কর্তৃত্ব আইন মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে সরাসরি প্রধান বিচারপতির হাতে ন্যস্ত করা হলো। রাষ্ট্রপতির আদেশে রবিবারই বাংলাদেশ গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায় অধ্যাদেশটি প্রকাশ করা হয়েছে।
সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদে বর্ণিত রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি অনুযায়ী নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে পৃথক করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও দীর্ঘকাল ধরে তা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হচ্ছিল না। বিশেষ করে আপিল বিভাগের ৭৯/১৯৯৯ নম্বর সিভিল আপীলের (ঐতিহাসিক মাসদার হোসেন মামলা) রায় বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে এই স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল। সংসদ ভেঙে যাওয়া অবস্থায় আশু ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেওয়ায় রাষ্ট্রপতি এই অধ্যাদেশ জারি করেন। এই অধ্যাদেশের ফলে এখন থেকে সুপ্রীম কোর্ট সচিবালয় সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করবে এবং এর সার্বিক নিয়ন্ত্রণ থাকবে কেবল প্রধান বিচারপতির হাতে। সচিবালয়ের প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে থাকবেন একজন সচিব, যিনি সরকারের সিনিয়র সচিবের পদমর্যাদা ও সুবিধাদি ভোগ করবেন এবং তিনি সরাসরি প্রধান বিচারপতির তত্ত্বাবধানে দায়িত্ব পালন করবেন।
নতুন এই আইনের ফলে বিচার বিভাগের ওপর আইন ও বিচার মন্ত্রণালয়ের দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক খবরদারির অবসান ঘটল। অধ্যাদেশের ৫ ধারা অনুযায়ী, এখন থেকে অধস্তন আদালত ও ট্রাইব্যুনালের বিচারকদের নিয়োগ, বদলি, পদায়ন, শৃঙ্খলা এবং ছুটির বিষয়গুলো সুপ্রীম কোর্ট সচিবালয়ই দেখভাল করবে। এর আগে এসব কাজের জন্য সুপ্রীম কোর্টকে আইন মন্ত্রণালয়ের ওপর নির্ভর করতে হতো যা বিচার বিভাগের স্বাধীনতার অন্তরায় হিসেবে বিবেচিত হতো। এখন থেকে বিচারিক কর্মে নিয়োজিত সার্ভিস সদস্যদের (জুডিসিয়াল সার্ভিস) নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলাবিধান সংক্রান্ত কাজে রাষ্ট্রপতির পক্ষে যাবতীয় প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করবে এই সচিবালয়। অধ্যাদেশে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, আপাতত বলবৎ অন্য কোনো আইনে যা কিছুই থাকুক না কেন, এই অধ্যাদেশের বিধানই প্রাধান্য পাবে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে বিচার বিভাগের আর্থিক ব্যবস্থাপনায়। অধ্যাদেশের ১১ ও ১২ ধারা অনুযায়ী, সুপ্রীম কোর্ট সচিবালয় এখন থেকে সম্পূর্ণ নিজস্ব বাজেট ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করবে। প্রতি অর্থবছর শুরুর অন্তত তিন মাস আগে সচিবালয় তাদের আওতাধীন আদালত ও দপ্তরের জন্য অনুমিত আয়-ব্যয়ের বিবৃতি প্রস্তুত করবে। সুপ্রীম কোর্ট ও এর সচিবালয়ের অনুকূলে জাতীয় বাজেটে বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয় করার ক্ষেত্রে এখন থেকে আর সরকারের পূর্বানুমোদনের প্রয়োজন হবে না। বাজেটে বরাদ্দকৃত অর্থ পুনঃউপযোজনের (Re-appropriation) সকল ক্ষমতা প্রধান বিচারপতির হাতে ন্যস্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ, বিচার বিভাগের উন্নয়ন বা প্রশাসনিক কাজে অর্থ ছাড়ের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় বা নির্বাহী বিভাগের দুয়ারে ধরনা দেওয়ার প্রথা বিলুপ্ত হলো।
বিচার প্রশাসনের উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ‘সুপ্রীম কোর্ট সচিবালয় কমিশন’ গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। প্রধান বিচারপতি এই কমিশনের চেয়ারপার্সন হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। কমিশনে সদস্য হিসেবে থাকবেন আইন উপদেষ্টা, আপিল বিভাগের একজন বিচারক, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারপার্সন এবং বাংলাদেশের অ্যাটর্নি জেনারেল। এছাড়া বিচার বিভাগের উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের জন্য একটি ‘পরিকল্পনা ও উন্নয়ন কমিটি’ থাকবে, যার নেতৃত্বে থাকবেন আপিল বিভাগের একজন জ্যেষ্ঠ বিচারক। ৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যয়ের প্রকল্প প্রধান বিচারপতি নিজেই অনুমোদন দিতে পারবেন, যা বিচারিক অবকাঠামো উন্নয়নে গতি আনবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সুপ্রীম কোর্ট সচিবালয়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রেও স্বতন্ত্র বিধিমালা অনুসরণ করা হবে। যতদিন পর্যন্ত নতুন বিধি প্রণীত না হচ্ছে, ততদিন প্রধান বিচারপতি বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিসের সদস্যদের মধ্য থেকে সচিবালয়ের কর্মকর্তা এবং সুপ্রীম কোর্ট ও অধস্তন আদালতের কর্মচারীদের মধ্য থেকে জনবল পদায়ন করতে পারবেন। গেজেট বিজ্ঞপ্তিতে স্বাক্ষর করেছেন লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের সচিব ড. হাফিজ আহমেদ চৌধুরী। এই অধ্যাদেশ জারির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থা এক নতুন যুগে প্রবেশ করল, যেখানে বিচারিক ও প্রশাসনিক কাজে নির্বাহী বিভাগের হস্তক্ষেপের আর কোনো সুযোগ রইল না।