মোহাম্মদ আবু দারদা, ফেনী।
নোয়াখালীর সেনবাগ থেকে চিকিৎসা নিতে আসা এক সাপে কাটা রোগী ২৯ নভেম্বর ২০২৫ তারিখ শনিবার সন্ধ্যায় ফেনী সদর হাসপাতালে স্থানান্তরের পথে মৃত্যুবরণ করেন। এর আগে রোগীকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় দাগনভূঞা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে আসা হয়েছিল। চিকিৎসকদের মতে, বিষধর সাপের দংশনের বিষয়টিকে গুরুত্ব না দেওয়া এবং হাসপাতালে আনতে কালক্ষেপণ করার ফলেই এই অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু ঘটেছে।
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণে জানা যায়, রোগীর স্বজনরা শুরুতে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রদান করেছিলেন। তারা দাবি করেছিলেন যে রোগীকে বিষহীন ঢোড়া সাপে কামড় দিয়েছে এবং তার শারীরিক দুর্বলতা অন্য কোনো কারণে সৃষ্টি হয়েছে। এই ভুল তথ্যের কারণে এবং হাসপাতালে পৌঁছাতে দেরি হওয়ায় রোগীর শরীরে বিষক্রিয়া দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কর্তব্যরত চিকিৎসকরা সন্দেহবশত রোগীর রক্ত পরীক্ষা করেন। পরীক্ষায় রক্ত জমাট বাঁধার সময় স্বাভাবিক পাওয়া যায়, যা নির্দেশ করে সাপের বিষটি হিমোটক্সিক বা ভাইপার জাতীয় ছিল না। তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই রোগীর দুই চোখের পাতা বন্ধ হয়ে আসা বা 'বাইলেটারাল টোসিস' লক্ষণ দেখা দেয়। এই লক্ষণ দেখে চিকিৎসকরা নিশ্চিত হন যে এটি নিউরোটক্সিন উৎপাদনকারী কেউটে বা ক্রেইট জাতীয় সাপের দংশন।
দাগনভূঞা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. বিউটি আক্তার এবং ডা. সুনন্দ সেন তাৎক্ষণিকভাবে ১০ ভায়াল এন্টিভেনম প্রস্তুত করে রোগীর শরীরে প্রয়োগ করেন। কিন্তু ততক্ষণে বিষক্রিয়া গভীর হওয়ায় রোগীর অবস্থার উন্নতি হয়নি। ধীরে ধীরে রোগীর ঘাড় সোজা রাখতে না পারা বা 'ব্রোকেন নেক সাইন' দেখা দেয় এবং শ্বাস-প্রশ্বাস যন্ত্রের মাংসপেশি অবশ হতে শুরু করে। এমতাবস্থায় জরুরি আইসিইউ সাপোর্টের প্রয়োজনে সরকারি অ্যাম্বুলেন্সের মাধ্যমে তাকে দ্রুত ফেনী সদর হাসপাতালে রেফার করা হয়। দুর্ভাগ্যবশত পথিমধ্যেই রোগী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
এই ঘটনার প্রেক্ষিতে চিকিৎসকরা সাধারণ মানুষের উদ্দেশ্যে বিশেষ সতর্কতা জারি করেছেন। তারা জানান, রক্ত পরীক্ষা করেই সাপের বিষ সম্পর্কে পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যায় না, কারণ নিউরোটক্সিন বিষের লক্ষণ প্রকাশ পেতে কয়েক ঘণ্টা সময় লাগতে পারে। তাই সাপ বিষধর বা নির্বিষ যা-ই হোক না কেন, দংশনের পরপরই রোগীকে হাসপাতালে এনে অন্তত ৬ থেকে ১২ ঘণ্টা চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণে রাখা অত্যাবশ্যক। দাগনভূঞা হাসপাতালে পর্যাপ্ত এন্টিভেনম মজুদ থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করে তারা জানান, সঠিক সময়ে চিকিৎসা শুরু করলে অনেক প্রাণ বাঁচানো সম্ভব। এছাড়া মাঠে কাজ করার সময় বা চলাচলে সতর্কতা অবলম্বন এবং সম্ভব হলে দংশনকারী সাপের ছবি তুলে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, যা চিকিৎসায় সহায়ক হতে পারে।